নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের লিকেজ বা সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। প্রতিটি ঘরের বাসিন্দারাই যেন তাজা বোমার সঙ্গে বাসবাস করছে। তিন বছরে জেলায়  গ্যাসের লিকেজ থেকে ৩২৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে কমপক্ষে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধ হয়েছে আরো শতাধিক। 

তিতাস গ্যাসের পুরনো জরাজীর্ণ সরবরাহ লাইন সংস্কার না করা ও কর্তৃপক্ষের অবেহলা, গ্রাহকের সচেতনতার অভাব, গ্যাসের চুলা বন্ধ না করাসহ নানা কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।  

ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের  সহযোগিতায়  অবৈধভাবে মাটির ওপর দিয়ে নিম্নমানের পাইপ, কোথাও প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে নেয়া গ্যাসের লাইনে আগুন ধরে দুর্ঘটনা ঘটছে।   

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সাল থেকে চলতি মার্চ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ৩২৪টি বিস্ফোরণে  ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে শতাধিক ব্যক্তি। তিতাস গ্যাসের লিকেজ ও সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বেশির ভাগ বিস্ফোরণ ঘটেছে। প্রতিটি বিস্ফোরণেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সংশ্লিষ্ট ভবনসহ আশপাশের বাড়িঘর। কিন্তু এসব বিস্ফোরণ থেকে কোনোভাবেই প্রতিকার মিলছে না। 

২০২২ সালে  জেলায় ১০৪টি বিস্ফোরণ ঘটে। এর মধ্যে তিতাস  গ্যাসের লাইনের ত্রুটিতে ৬৯টি। রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার ও এসি বিস্ফোরণ ঘটেছে ৩৪টি। এসব বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। দগ্ধ হয়েছেন আরো ২৫ জন। 

২০২১ সালে ১১৪টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।  এর মধ্যে তিতাস গ্যাসের লাইনে ত্রুটির কারণে ৯৬টি,  রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার ও এসি বিস্ফোরণে ১৮টি।  মারা যান ২০ জন, দগ্ধ হন ৫০ জন। 

২০২০ সালে ১০৬টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তিতাস গ্যাসের  লাইনের ত্রুটির কারণে  ৭১টি, অন্য কারণে বিস্ফোরণ ঘটে ১১টি। মারা যান ৪৪ জন। দগ্ধ হন আরো ২৬ জন। যদিও এর বাইরেও জেলায় আরো ছোটবড় অনেক বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান নেই ফায়ার সার্ভিস বা পুলিশের কাছে। তাদের দাবি, নিহত ও দগ্ধের সংখ্যা আরো বেশি।

চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত পাঁচটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে নগরীর ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় একটি বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে আগুন ধরে যায়। এক অন্তঃসত্ত্বা কুলসুম বেগম ও ছেলে খালিদ হোসেন (৩) আগুনে দগ্ধ হয়েছেন। গতকাল সকালে কুলসুম বেগম আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে কুলসুম বেগম একটি ছেলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের কাঠেরপুর এলাকায় বিস্ফোরণে আগুন ধরে স্বামী-স্ত্রীসহ পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। পরের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি  শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গৃহবধূ সুখি আক্তার। এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন স্বামী আল আমিন। 

নারায়ণগঞ্জে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। এ দিন এশার নামাজের সময় নারায়ণগঞ্জের তল্লা জামে মসজিদে গ্যাস নির্গত হয়ে বিস্ফোরণে মারা যান ৩৬ জন । আহত হন আরো সাত-আটজন। সে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কলেজপড়ুয়া দুই ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা পারুল বিবি। কলেজপড়ুয়া দুই ছেলেই ছিলেন নামাজি। তাই তো শবেবরাত ও রমজানসহ বিশেষ দিনগুলোয় দুই ছেলের ছবি হাতে নিয়ে ডুকরে কেদেঁ ওঠেন তিনি। পারুল বিবি বলেন, ‘গ্যাসের বিস্ফোরণে আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। সরকার যেন বিষয়গুলো তদন্ত করে সারা দেশের গ্যাসের লাইনগুলো মেরামত করে দেয়।’  

একই ঘটনায় নিহত হন তল্লা এলাকার শিক্ষক অহিদুল হক। তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, ‘‌ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পর সরকার তিতাস গ্যাসের সরবরাহ লাইন সংস্কার করবে বলে আমাদের  জানিয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো জরাজীর্ণ পুরনো লাইন দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে জেলার বিভিন্ন স্থানে একের পর বিস্ফোরণ ঘটছে। মারা যাচ্ছে মানুষ।’

তল্লা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘তিতাস গ্যাসের অফিসের লোকজন ঘুস ছাড়া কোনো কাজ করে না। তাদের কাছে বারবার অভিযোগ করলেও প্রতিকার পাওয়া যায় না।’ 

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের নারায়ণগঞ্জে উপসহকারী পরিচালক ফখরুদ্দিন জানান, তিতাস গ্যাসের লিকেজ বা সিলিন্ডার লাইনের লিকেজ থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে বন্ধ ঘরে মিথাইন গ্যাস উড়তে থাকে কিংবা জমাট বেঁধে যায়। ফলে রান্নাঘরে গিয়ে দিয়াশলাই বা বৈদ্যুতিক সুইস দেয়ার সময় স্পার্ক করলেই বিকট শব্দে আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সেজন্য প্রতিটি গ্রাহককে সচেতন হতে হবে।’  

তবে সরবরাহ লাইনের লিকেজের কারণে বিস্ফোরণ ঘটে প্রাণহানি হচ্ছে—এমন কথা মানতে নারাজ তিতাস গ্যাসের নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপমহাব্যবস্থপক মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘বাসাবাড়ির বাইরে পর্যন্ত সরবরাহ লাইন তিতাস কর্তৃপক্ষের। ভবনের ভেতর যেসব লাইন নেয়া হয় সেগুলো গ্রাহকের। সেটি দেখভালের দায়িত্বও গ্রাহকের, তিতাসের নয়। যেসব বিস্ফোরণ ঘটছে, তা হচ্ছে গ্রাহকের সচেতনতার অভাবে। ঘরের ভেতরে গ্যাস লাইন লিকেজ আছে কিনা তাও দেখার দায়িত্ব গ্রাহকের।’ তিনি দাবি করেন, ‘কোথাও লাইনের লিকেজের খবর পাওয়া গেলে আমরা দ্রুত তা মেরামতের ব্যবস্থা করি।’