নারায়ণগঞ্জে তিতাস গ্যাসের অবৈধ লাইনের ছড়াছড়ি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি এবং তিতাস গ্যাসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে বাসাবাড়ি ও শিল্পকরাখানায় এসব সংযোগ নেয়া হয়েছে। উন্মুক্তভাবে প্লাস্টিকপাইপ বা জরাজীর্ণ লোহার পাইপ দিয়ে নেয়া হয়েছে এসব গ্যাস সংযোগ। যে কোনো সময় ঘটতে পারে মসজিদে বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
তিতাস গ্যাস অফিস সূত্রে জনা যায়, ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ ঘোষণা করা হলেও গত ১০ বছরে পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলায় ১৭৯ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া হয়েছে, যার গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২ লাখ।
২০১৩ সালের ৭ মে আবাসিক গ্যাস সংযোগ চালু করার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে হাজার হাজার বাড়িতে গ্যাসের সংযোগ নেয়া হয়েছে। শুধু আবাসিক বাড়িতেই নয়, শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে বাণিজ্যিক লাইনেও রয়েছে কয়েকশ অবৈধ সংযোগ।
তবে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী মোহাম্মদ আল মামুন জানিয়েছেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, আগামী ২ মাসের মধ্যে সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। সেখানে নারায়ণগঞ্জকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, তিতাসের পক্ষে একা এই বিশাল কাজটি করা কষ্টসাধ্য। তাই এক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সর্বাধিক অবৈধ লাইন বন্দর উপজেলায়
গত দুবছরেই তিতাস কর্তৃপক্ষের অভিযানে বিচ্ছিন্ন হওয়া অবৈধ গ্যাস লাইনের সংখ্যাই বলে দেয় বন্দর উপজেলায় কী পরিমাণ অবৈধ সংযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর থেকে ১৪ নভেম্বর ১০ দিনে জেলার রূপগঞ্জ ও বন্দরের বিভিন্ন ইউনিয়নের ১১ হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তিতাসের ভ্রাম্যমাণ আদালত। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি বন্দরের বিভিন্ন ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে ১৫ হাজার এবং ১৯ আগস্ট শুধু বন্দরের কলাগাছিয়া ইউনিয়নেই ৬ হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বন্দরের বিভিন্ন ইউনিয়নের অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধ গ্যাস সংযোগের মূল হোতাই হলেন এখানকার কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এসব চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া বৈধ বা অবৈধ যেকোনো গ্যাস সংযোগ দেয়ার ক্ষমতা তিতাস কর্মকর্তাদেরও নেই। এছাড়া বন্দরের সিটি করপোরেশনের ৯টি ওয়ার্ডে গ্যাস সংযোগের তদারকিতে আছেন স্থানীয় কাউন্সিলর, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রভাবশলী আর তিতাসের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশেই পুরো বন্দর উপজেলায় হাজার হাজার বাড়িতে অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে গত কয়েক বছরে। প্রতি গ্যাস সংযোগের জন্য প্রতিটি বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র।
বন্দর উপজেলার মুসাপুর ও ধামগর ইউনিয়নের গোকুল দাসেরবাগ, কুটিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে মাটির উপর দিয়ে প্লাস্টিকের পাইপ, জরাজীর্ণ লোহার পাইপ দিয়ে ঝূঁকিপূর্ণভাবে নেয়া হয়েছে গ্যাসের সংযোগ। প্রতি সংযোগ বাবদ বন্দর মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন ও তার লোকজন ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা করে নিয়েছে বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন বলেন, আমরা শুধু তদারকি করেছি যেন ঠিকাদাররা মানুষের টাকা না মেরে দেয় এবং গ্যাস লাইন যাতে পারে। আমাদের এলাকার মানুষের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সংযোগ দিয়েছি।
তিনি বলেন, শুধু শহরের মানুষ সুবিধা ভোগ করবে, আর গ্রামের মানুষ গ্যাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে তা হবে না। যারা গ্যাস সংযোগ পেয়েছেন সেসব গ্রাহক বৈধ হতে চান।
কিন্তু তিতাসের নতুন সংযোগ দেয়া বন্ধ থাকার পরও কীভাবে সংযোগ নেয়া হয়েছে? এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি চেয়ারম্যান।
অভিযোগ রয়েছে বন্দরের এক ইউপি চেয়ারম্যানের নিজের প্রতিষ্ঠানই চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে। উপজেলায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বন্দর ও কলাগাছিয়া ইউনিয়ন। এই দুই ইউনিয়নেই রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার অবৈধ সংযোগ।
সোনারগাঁয়ে গ্যাসের হরিলুট
সোনারগাঁ পৌর এলাকা ছাড়াও ১০টি ইউনিয়নের এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেই। অভিযোগ রয়েছে শিল্পাঞ্চল কাচপুর, বিসিকসহ আশপাশের শিল্পঘন এলাকায় যথেচ্ছ প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার হচ্ছে। উপজেলার ফুলদী গ্রামের বাসিন্দা আলী আজগর বলেন, ‘গ্যাস-সংযোগ নিতে আমরা ও আশপাশের গ্রাহক প্রতি প্রায় ৭০/৮০ জন ৪৫ হাজার টাকা করে দিয়েছি।
সাবেক ইউপি মেম্বার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলার সর্বত্র এরই মধ্যে গ্যাস পৌঁছে গেছে। তাই আমরাও গ্যাস নিয়েছি। যেহেতু সরকার কাউকে বাধা দেয়নি, তাই সবার যা গতি হয় আমাদেরও তা-ই হবে।’
সিদ্ধিরগঞ্জে গ্যাস চুরি কোনো অপরাধ নয়!
সিদ্ধিরগঞ্জের ১৬টি চুনা ফ্যাক্টরি ও প্রায় ২০টির বেশি মশার কয়েল ফ্যাক্টরির অধিকাংশই চলে অবৈধ সংযোগ দিয়ে। গত কয়েক বছরে যেক’টি মশার কয়েল ফ্যাক্টরি সিলগালা করা হয়েছে তার চেয়েও বেশি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে।
স্থানীয়রা জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের ১৬টি চুনা ফ্যাক্টরি বাইপাসের মাধ্যমে গ্যাস চুরি করে আসছে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। কিন্তু এসব ফ্যাক্টরিতে কবে কখন অভিযান চলেছে কেউ জানে না। পাশাপাশি গত ১০ বছরে সিদ্ধিরগঞ্জে নতুন গড়ে ওঠা কয়েক হাজার বাসা-বাড়িতে চুলা জ্বলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে।










