রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলায় পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে একটি ইটভাটা। পাহাড়ের বাকি অংশের সেগুন বাগানের কাঠ পোড়ানো হচ্ছে এ ভাটায়। খাড়াভাবে কাটায় পাহাড়টি আসন্ন বর্ষায় ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইটভাটায় সেগুন কাঠ পোড়ানোয় একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে বনায়ন। তবে অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
রাঙ্গামাটির রাজস্থলী-বাঙ্গালহালিয়া সড়ক লাগায়ো খোরাইম্রংপাড়া এলাকায় এ ইটভাটা তৈরি করা হয়েছে। এটির নাম ‘বিআরবি ব্রিকস’। রাজস্থলী উপজেলায় সদর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এ ইটভাটার অবস্থান। ভাটার মালিক সাধন দত্ত ও মো. আজিজ।
সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অন্তত ১৫০ ফুট উচ্চতার ওই পাহাড়ের একটি অংশ কেটে নেয়া হয়েছে। এটি কাটা হয়েছে সম্পূর্ণ খাড়াভাবে। প্রায় দেড় একরের বেশি পাহাড় কেটে সমতল করে ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। কেটে নেয়া মাটি ভাটার পাশেই স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া যাতায়াতের জন্য ভাটার পেছনে আরো একটি পাহাড় কেটে সড়ক তৈরি করা হয়েছে। পাহাড়ের বাকি অংশে রয়েছে সেগুন বাগান। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে ওই বাগানের সেগুন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। জানা গেছে ইটভাটাটির সরকারি অনুমোদনও নেই।
পরিবেশবাদী বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় পাহাড় কাটার যজ্ঞ চললেও তা বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এতে বিপদে পড়েছেন পাহাড়ের বাসিন্দারা। আসন্ন বর্ষায় পাহাড়টি পুরোপুরিভাবে ধসে পড়তে পারে। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে পাহাড় কাটার কারণে দিন দিন পার্বত্য চট্টগ্রামে বনভূমির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে পরিবেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ১৯৯৫ অনুযায়ী পাহাড় কাটা অবৈধ হলেও আইনের তোয়াক্কা না করেই ইটভাটা তৈরি করেছেন মালিকরা। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ১৯৯৫ এর ৬(খ) অনুযায়ী পরিবেশ সুরক্ষায় পাহাড় কাটায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই আইনে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কাটা যাবে না বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভাটা নির্মাণ ও ইট প্রস্তুত আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ইটভাটা স্থাপনের নিয়ম নেই। কিন্তু বিআরবি ইটভাটাটি খোরাইম্রংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘেঁষেই স্থাপন করা হয়েছে। ইটভাটার ধোঁয়া লোকালয়ের বাসিন্দাদের জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে ফেলছে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের নির্বাহী পরিচালক ফজলে এলাহী বণিক বার্তাকে জানান, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্ষায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। কয়েক বছরে রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। দেখা যাচ্ছে, যারা এসব পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত, তারা হয় প্রভাবশালী নয়তো প্রভাবশালীদের মদদপুষ্ট। প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় পাহাড় কাটার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অবিলম্বে এসব অপতত্পরতা বন্ধ করা না গেলে ভয়াবহ পরিবেশ ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ ইটভাটা পার্বত্য এলাকার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ হুমকির মুখে ফেলেছে। আবার এসব ইটভাটায় বনের কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ফলে উজাড় হচ্ছে বনজ সম্পদ।
এসব প্রসঙ্গে ইটভাটা মালিক সাধন দত্ত বলেন, ইটভাটার অনুমোদনের জন্য কাগজপত্র জমা দেয়া হয়েছে, তবে এখনো অনুমোদন পাইনি। পাহাড় কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে ইটভাটার অংশীদার মো. আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। মো. আজিজ বলেন, ‘পাহাড়টি আমার ব্যক্তিগত, তাই কেটেছি। তবে ইটভাটা স্থাপনের জন্য পাহাড় কাটার অনুমতি নিইনি। এসব কাজে একটু অসঙ্গতি রয়েছে। সবসময় তো নিয়ম মানার সুযোগ নেই।’
রাজস্থলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শেখ ছাদেক বণিক বার্তাকে জানান , ‘কয়েক মাস আগে ইটভাটা মালিকদের কাছে ভাটা স্থাপনের অনুমতিসহ প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। তারা এখনো কাগজপত্র জমা দেয়নি। পাহাড় কাটা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি) মোহাম্মদ জমির উদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরিবেশ আইন অনুযায়ী কোনোভাবেই পাহাড় কাটা যাবে না। যারা আইন অমান্য করেছেন, আমরা খোঁজখবর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’










