স্বৈরাচার পতন ঘটানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রমাণিত সাফল্য রয়েছে উল্লেখ করে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহ্‌ফুজ আনাম বলেছেন, স্বৈরাচারকে উৎখাতে ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় ঈর্ষণীয় সক্ষমতা আছে। তবে স্বৈরাচার উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমরা যতটা ভালো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ততটাই খারাপ।

আজ রোববার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’–এর দ্বিতীয় দিন ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শীর্ষক পর্বে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহফুজ আনাম বলেন, স্বৈরাচার উৎখাতের সময় জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়, কিন্তু স্বৈরাচার উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। যে গোষ্ঠীগুলো স্বৈরাচার উৎখাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছিল, তারাই পরে একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়।

মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু এরপর আমরা এ দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হই। ফলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সবশেষ পতন হয় এরশাদের। ১৯৯১ সালে আমরা গণতন্ত্রে ফিরে আসি। তখন আমরা সত্যিই আশা করেছিলাম, এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটবে।

দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বেশ কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি ঊল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার পরিবর্তে আমরা ক্রমেই সংঘাত ও ধ্বংসের দিকে এগিয়েছি। এর মূল কারণ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ। কে কোন দলের সমর্থক, তার ভিত্তিতে সব পেশাই এখন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। সবার সেবা করার শপথ নেয়া চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবী থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও এটি ঘটছে। অথচ বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষ থাকাটা জরুরি।

ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়, তখন আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে সেটিকে উদ্‌যাপন করি। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা দেখতে পাই, নির্বাচনের ফলাফল, অর্থাৎ জনগণের ইচ্ছা জনস্বার্থে রূপান্তরিত হওয়ার বদলে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।...পুরো সরকারব্যবস্থাকে নিজের দলের একটি সম্প্রসারণে পরিণত করা—এখান থেকেই পতনের শুরু। এর ফলাফল হয় দুর্নীতি, দলীয় পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও আনুকূল্য। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আমাদের পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

প্রযুক্তি একটি দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং দক্ষ ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, প্রযুক্তি আমাদের খুবই কার্যকর আমলতন্ত্র ও পুলিশ দিতে পারে। সেখানেই বাংলাদেশ এখন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমরা যদি অগ্রগতি অর্জন করতে চাই, তাহলে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যা পরিচালনা করা সহজ নয়। এ দেশের ভূমির পরিমাণ কম, কিন্তু জনসংখ্যা বিপুল। এ ছাড়া প্রাকৃতিক নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনাও রয়েছে, যদি দেশের মানবসম্পদকে মূল্যবান ও উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করা যায়। এটি সম্ভব প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সুশাসনের মাধ্যমে।