যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে তাণ্ডবের চিহ্ন রেখে গেছে শক্তিশালী হারিকেন আইডা। হারিকেনের আঘাতে মেক্সিকো উপসাগরে অবস্থিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ৯৪ শতাংশ উত্তোলন কার্যক্রম। খবর রয়টার্স ও দি ইকোনমিক টাইমস।

জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো গত সোমবার থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা শুরু করেছেন। আইডার প্রভাবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে লুইজিয়ানা। ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয় অঙ্গরাজ্যটির পাওয়ার গ্রিড। পাশাপাশি তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে কোম্পানিগুলো জ্বালানি তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাত প্লান্টগুলো পুনরায় চালু করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা জানান, নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হতে আরো সপ্তাহখানেক সময় লাগতে পারে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে জ্বালানি তেল উত্তোলন অবকাঠামো মেরামত ও পুনরায় চালু করার কার্যক্রম। উত্তোলন, পরিশোধনসহ অন্যান্য কার্যক্রম পুরোপুরিভাবে চালু হতে আরো অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানান তারা।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত ভয়াবহ তাণ্ডব চালায় হারিকেন ইসাইয়াস। এর প্রভাবে লেক চার্লস ও লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াজাত প্লান্টগুলো পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল। ফলে উৎপাদনে ধস নামে। কয়েক লাখ ডলারের লোকসান গুনতে হয় কোম্পানিগুলোকে।

মিজোহু সিকিউরিটিজের এনার্জি ফিউচারসের পরিচালক রবার্ট ইয়োগার বলেন, আপনি চাইলেই সুইচ অন করে পরিশোধন কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন শুরু করে দিতে পারবেন না। এমন দুর্যোগের পর পরিশোধন কেন্দ্রগুলোতে কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে দুই থেকে সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ লাগতে পারে।

লুইজিয়ানা ও মিসিসিপি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে হয়ে পড়ায় কয়েকশ জ্বালানি তেল উৎপাদন কেন্দ্র খালি করা হয়েছে। প্রায় ১১ লাখ বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সোমবার বিদ্যুত্হীন ছিল বলে জানিয়েছে রয়টার্স। লুইজিয়ানার নর্কো এবং বেলা কাসার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন কেন্দ্রগুলো ঝড়ের পর জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

লুইজিয়ানার সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনার্জি করপোরেশন জানায়, ট্রান্সমিশন লাইনগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি টাওয়ার ভেঙে মিসিসিপি নদীতে পড়ে গেছে।

বিশ্বের বৃহৎ জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলোর একটি এক্সন মবিল করপোরেশন। কোম্পানিটি বেটন রৌগ অয়েল প্রসেসিং এবং কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে দৈনিক ৫ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে। কিন্তু হারিকেন আইডার প্রভাবে প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

এক্সন মবিল করপোরেশনের মুখপাত্র বার্নাডো ফালাস বলেন, লুইজিয়ানার যেসব এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেসব এলাকায় পরিশোধন কেন্দ্রগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবে ফিলিপ-৬৬।

জ্বালানি তেলসংক্রান্ত তথ্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডি জানায়, চলমান সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গ্যাসোলিনের খুচরা দাম গ্যালনপ্রতি ৫-১৫ সেন্ট বেড়েছে। প্রধান প্রধান জ্বালানি পাইপলাইন নেটওয়ার্ক পুনরায় চালু হওয়া এবং বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হওয়ার ওপর জ্বালানি পণ্যের বাজারের উত্থান-পতন নির্ভর করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পাইপলাইন নেটওয়ার্ক কলোনিয়াল পাইপলাইন করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বন্ধ হয়ে যাওয়া সরবরাহ পুনরায় চালুর প্রত্যাশা করছে। পূর্ব উপকূলসহ যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও বেশি গ্যাসোলিন সরবরাহ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।

জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো অফশোর (মূল ভূখণ্ডের বাইরে) উত্তোলন কেন্দ্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ শুরু করেছে। রয়াল ডাচ শেল কোম্পানি জানায়, গত সোমবার থেকে তারা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোগুলোর পর্যবেক্ষণ শুরু করে। এছাড়া বিপি, বিএইচপি, শেভরন ও এক্সন মবিল তাদের অবকাঠামোগুলোর ক্ষতি নিরূপণ করছে।

জ্বালানি তেল উত্তোলন কোম্পানি ইকুইনরের মুখপাত্র ওলা মর্টেন বলেন, হারিকেন আইডার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে।

রয়টার্স জানায়, হারিকেনের আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে মেক্সিকো উপসাগরে অবস্থিত ২৮৮টি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন কেন্দ্র খালি করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে দৈনিক ১৭ লাখ ২০ ব্যারেল জ্বালানি তেল এবং দৈনিক ২০১ কোটি ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানি তেল আমদানি-রফতানি টার্মিনালগুলোও স্থবির হয়ে পড়েছে।