সংস্থাটি বলছে, সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের তারল্য সংকট বা লিকুইডিটি সমস্যা তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এ বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকার নিয়ে নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণের প্রাপ্যতা কমে যাবে এবং বাজারে সুদের হার আরো বেড়ে যাবে। রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল বাজেট-পরবর্তী মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ তথ্য তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক এ আয়োজনে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট গবেষক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি চলছে, ফলে এমনিতেই ঋণের সুদের হার বেশি। এ অবস্থায় সরকারের বাড়তি ঋণনির্ভরতা “‍কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস” অর্থাৎ ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেবে।’

বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বর্তমানে আস্থার অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যদি প্রয়োজনীয় ঋণ না পায় কিংবা ঋণের উচ্চ সুদের কারণে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারায়, তবে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে। ফলে সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না।’

মূলত এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে না পারায় ব্যাংক ঋণের ওপর এ চাপ বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন ড. ফাহমিদা খাতুন।

অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বাজেটটি এমন এক সময় এসেছে, যখন অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। দেশে বিগত প্রায় চার বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বর্তমানে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পাশাপাশি খাদ্যের সরবরাহ ও জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে এটি অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন নিম্ন ঝুঁকি থেকে ‘মডারেট রিস্ক’ অর্থাৎ মধ্যবর্তী ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে, যা ঋণ স্থায়িত্বের জন্য চিন্তার বিষয়। এ ক্ষেত্রে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ঋণের সঠিক ব্যবহার অপরিহার্য বলে মনে করে সিপিডি।

রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে, যা অর্জন করতে হলে ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বর্তমান প্রশাসনিক দক্ষতা ও অটোমেশনের অভাব বিবেচনায় এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।’

বাজেটে ব্যয়ের খাত নিয়ে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো থোক বরাদ্দে প্রায় ১ হাজার শতাংশের (৯৯৮ দশমিক ৪) উল্লম্ফন অস্বাভাবিক। নির্দিষ্ট প্রকল্প ছাড়া এ বিশাল পরিমাণ অর্থের ব্যয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংকটে পড়তে পারে এবং অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এদিকটায় বিশেষ নজরদারি রাখা উচিত।’

ব্যক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত সীমাকে পর্যাপ্ত নয় উল্লেখ করে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘নিম্ন আয়ের মানুষের কথা ভেবে এ সীমা আরো বাড়ানো উচিত ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে করমুক্ত আয়ের যে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বর্তমান কর কাঠামোতে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই করের বোঝা অনেক বেশি পড়ছে।’

অন্যদিকে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা করের ন্যায্যতা নষ্ট করে এবং সৎ করদাতাদের জন্য একটি ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।’ তবে স্বাস্থ্য খাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের শুল্ক প্রত্যাহার এবং সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর অব্যাহতির প্রস্তাবকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটকে অবাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো একটি গতানুগতিক বাজেট বলে আখ্যা দিয়েছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এ বাজেটে আকাঙ্ক্ষা অনেক থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবসম্মত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ওপরে ভিত্তি করে একটা প্রাক্কলন করেছে। এখানে সম্পদ আহরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণ, আমদানি-রফতানি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি—সবকিছুর জন্যই চলতি অর্থবছরের আলোকে যে ভিত্তিটা করা হয়েছে, আমাদের বিবেচনায় সে ভিত্তিটাই ঠিক নয়।’

ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘এ দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেটের সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে প্রাক্কলনগুলো করা হলে বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও এর বাস্তবায়নযোগ্যতা অনেক বেশি সুদৃঢ় হতো। অথচ সরকারের সামনে সুযোগ ছিল প্রকৃত বাস্তবতা স্বীকার করে ভিত্তি ঠিক করা। কারণ অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার এটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অভিযোগ করে বলেন, ‘টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে ‘গুড ভ্যালু ফর মানি’ অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সে বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়নি।’