অস্ট্রেলীয় আকরিক লোহার সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার চীন। চলতি বছরের মে ও জুনে চীনে রেকর্ড আকরিক লোহা রফতানি করে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু এর পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে বড় ধরনের ধস নামে রফতানিতে। বছরের বাকি মাসগুলোতে রফতানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা আরো প্রকট হবে বলে জানিয়েছেন চীনের শিল্প খাতসংশ্লিষ্টরা। খবর গ্লোবাল টাইমস।

নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর উত্পত্তি ইস্যুতে গত বছর থেকেই চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নেয়। নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেও। চীনের বাজারে বিশেষ করে গরুর মাংস, ওয়াইন ও কয়লা রফতানিতে অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটিকে। চীনের বাজারে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে কাজ করছে ব্রাজিল, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে দুই দেশের মধ্যে বিষবাষ্প ছড়াতে শুরু করার পর চীন অস্ট্রেলীয় বিভিন্ন পণ্যের ওপর ২১৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। এতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বনিম্নে নেমে যায়।

তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল আকরিক লোহা। চীন বিশ্বের শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদন এবং ব্যবহারকারী দেশ। ব্যবহারিক ধাতুটি তৈরিতে অপরিহার্য উপাদান আকরিক লোহা। এ ধাতু রফতানিতে নেতৃস্থানীয় অস্ট্রেলিয়া। আকরিক লোহার দেশীয় চাহিদা মেটাতে অস্ট্রেলিয়ার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল চীন। মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ আকরিক লোহাই আসে বহির্বিশ্ব থেকে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই সরবরাহ করে অস্ট্রেলিয়া। ফলে পণ্যটি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। চলতি বছরের মে থেকে জুন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া থেকে রেকর্ড পরিমাণ আকরিক লোহা আমদানি করে চীন। আগস্টেও আমদানির পরিমাণ ছিল লক্ষণীয়।

তবে ধীরে ধীরে অস্ট্রেলীয় আকরিক লোহানির্ভরতা কমিয়ে আনছে চীন। নির্ভরতা অর্ধেকেরও নিচে নামিয়ে আনার পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার খসড়া করেছে দেশটির সরকার। বিকল্প হিসেবে ব্রাজিল থেকে আকরিক লোহা আমদানি বাড়ানোর প্রয়াস চালাচ্ছে দেশটি। তালিকায় রয়েছে রাশিয়া, মিয়ানমার, কাজাখস্তান ও মঙ্গোলিয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান উপাদান অস্ট্রেলীয় আকরিক লোহা। কিন্তু চীনে আকরিক লোহার চাহিদা ও দাম কমতে থাকায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

লাঞ্জ স্টিল ক্লাউড বিজনেস প্লাটফর্মের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ মে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটসে আকরিক লোহার মূল্যসূচক রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে টনপ্রতি ২৩৩ ডলারে উন্নীত হয়। কিন্তু ২১ সেপ্টেম্বর মূল্যসূচক ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমে টনপ্রতি ৯৪ ডলারে নেমেছে। যদিও এর একদিন পর সিঙ্গাপুরে পণ্যটির দাম ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। তবে চাহিদা দুর্বল থাকায় বাজার নিম্নমুখীই থাকবে।

চীন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি রোধের অংশ হিসেবে ইস্পাত উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনছে। ফলে ব্যবহারিক ধাতুটির প্রধান উপাদান আকরিক লোহার চাহিদা দিন দিন নিম্নমুখী হচ্ছে। এটি দরপতনে অনুঘটকের কাজ করছে। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, চীনের বাজারে অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যের অবসান ঘটাতেই আকরিক লোহার বাজার নিয়ান্ত্রণ করছে চীন।

বেইজিং লাঞ্জ স্টিল ইনফরমেশন রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা পরিচালক ওয়াং গোকিং বলেন, বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চলতি বছর চীন দৈনিক ইস্পাত উৎপাদন কমিয়ে প্রায় ২৬ লাখ টনে নিয়ে আসবে। এ প্রাক্কলনের ভিত্তিতে বছর শেষে আকরিক লোহা আমদানি ৮ শতাংশ কমে ১০ লাখ ৬০ হাজার টনে নেমে আসতে পারে।