জিডিপি প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ না হওয়ায় শ্লথ অর্থনীতির জট ছাড়াতে পারছে না চীনের অর্থনীতি। এর অন্যতম কারণ প্রপার্টি খাতের ধস ও স্থানীয় সরকারগুলোর অতিমাত্রায় ঋণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশটির জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং ভোক্তা চাহিদার নিম্নমুখিতা। এরই প্রভাব পড়েছে দেশটির অবসরপ্রাপ্ত ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের ওপর। প্রবীণদের আর্থিক সহায়তা দেয়া একটি ট্রাস্ট ফান্ড সম্প্রতি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। খবর এপি।
চীনে প্রবীণদের আর্থিক সহায়তা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সিচুয়ান ট্রাস্ট। সংস্থাটির সদর দপ্তর দক্ষিণ-পশ্চিম শহর চেংদুতে। সিচুয়ান ট্রাস্ট সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, সংস্থাটি ২০২০ সালে দেউলিয়া হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ অ্যাকাউন্ট এবং শপিং মল ও অন্যান্য প্রকল্পে বিনিয়োগ ব্যর্থ হয়ে এমনটা ঘটেছে। চলতি মার্চে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। প্রপার্টির মূল্য কমেছে ২০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
বিশ্লেষকরা জানান, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হচ্ছে চীন। দেশটির অর্থনীতি মূলত রিয়েল এস্টেট খাতের উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশটির প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। এ খাতে দেশটির বিপুল কর্মসংস্থানও রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশটিতে প্রপার্টির দাম ও বিক্রি ক্রমে কমে যাচ্ছে। কয়েকটি বড় ডেভেলপার কোম্পানি ঋণখেলাপি হওয়ার পর স্থানীয় সরকারের ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটির নীতিনির্ধারকরা এ নিয়ে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছেন।
বেইজিংয়ে গত সপ্তাহে চীনা সরকারের সর্বোচ্চ সংস্থা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ওই অধিবেশনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ঘোষণা করেন, প্রপার্টি খাতের সংকট সমাধান ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে চীন।
যেসব অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ সিচুয়ান ট্রাস্ট বা এ ধরনের সংস্থায় সঞ্চয় জমা করেছিলেন, তারা তাদের লভ্যাংশ পাচ্ছেন না। আট হাজারের বেশি বিনিয়োগকারীর মধ্যে ৩০০ জন সরকারের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। তারা আইনি সহায়তা পেতে এরই মধ্যে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
একজন বিনিয়োগকারী জানিয়েছেন, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের অধিবেশন চলাকালে তারা প্রতিবাদ জানাতে বেইজিংয়ে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের রাস্তা আটকে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, চীনের সরকারি দল কমিউনিস্ট পার্টি উভয় সংকটে পড়েছে। ঋণ একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রপার্টির দাম কমা সত্ত্বেও জনগণ কৃচ্ছ্র সাধন করছে। ভোক্তা চাহিদাও নিম্নমুখী। রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর বিক্রি একেবারে তলানিতে। মুনাফা কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাইয়ে বাধ্য হচ্ছে। অনেক কোম্পানি বিনিয়োগ কমিয়ে আনছে, যা দেশটির সার্বিক অর্থনীতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
সিনহুয়া ইউনিভার্সিটির ফাইন্যান্সের অধ্যাপক মিশেল পেটিস বলেন, ‘চীনের ঋণ সংকট একদিন কেটে যাবে। কিন্তু ততদিনে অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে। কারণ কেউই লোকসান মেনে নিতে চায় না।’
বিশ্লেষকরা জানান, চীনে বিনিয়োগকারী ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি সংযোগের কাজ করত ট্রাস্ট ফান্ডগুলো। সংস্থাগুলো বিজ্ঞাপনে নিজেদের বিশ্বস্ত হিসেবে দাবি করত। সরকার অনুমোদিত উচ্চ সুদের নিশ্চয়তার কথা বলত। সংস্থাগুলো অনেকটা প্রাইভেট কোম্পানির মতো বিনিয়োগ করত। কারখানা বা শপিং মল স্থাপনেও বিনিয়োগ করত। সিচুয়ান ট্রাস্ট দেউলিয়াত্বের কারণ সরকারের নতুন নীতিমালা। ২০২০ সালে চীনা সরকার ট্রাস্ট ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা আরোপ করে। এ কারণে সিচুয়ান ট্রাস্ট নতুন বিনিয়োগ হারায়। মুনাফা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় সংস্থাটি।
বেইজিংয়ের রুশি ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের চিফ অ্যানালিস্ট ঝু ঝেনশিন বলেন, ‘যদি কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট মুনাফা করতে না পারে, এক্ষেত্রে দেউলিয়াত্ব অনিবার্য।’










