রাশিয়ার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি গত মাসে কমে দুই বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে। একই সঙ্গে কমেছে রফতানি আয়ও। মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণে উত্তোলন ও রফতানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় এমনটি ঘটেছে। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাও রফতানিতে প্রভাব ফেলেছে। খবর অয়েলপ্রাইসডটকম। 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সম্প্রতি অয়েল মার্কেট রিপোর্ট শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, জুনে রাশিয়ার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি প্রতিদিন ছয় লাখ ব্যারেল করে কমেছে, দুই বছরের মধ্যে যা সর্বনিম্ন। মোট দৈনিক রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩ লাখ ব্যারেলে। এর আগে ২০২১ সালের মার্চে রফতানি এতটা নিম্নমুখী হয়ে পড়েছিল। 

এদিকে রফতানি আয় গত মে মাস ও গত বছরের জুনের তুলনায় কমেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, জুন রাশিয়ার জ্বালানি তেল রফতানি আয় মে মাসের তুলনায় ১৫০ কোটি ডলার কমেছে। আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৮০ কোটি ডলারে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে রাশিয়ার বাজেটে তেল ও গ্যাস থেকে রাজস্ব কমে ৫৮০ কোটি ডলারে নেমেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ কম। চলতি বছরের মে মাসের তুলনায় রাজস্ব কমেছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। 

রাশিয়া গত সপ্তাহে জানায়, দেশটি আগস্টে দৈনিক পাঁচ লাখ ব্যারেল করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি কমাবে। উদ্দেশ্য বাজারে ভারসাম্য তৈরি করা। এ লক্ষ্যে দেশটি জ্বালানি তেল উত্তোলনও কমাচ্ছে। 

এরই মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব ও রাশিয়া। পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ফেরাতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশ দুটি। এদিকে উত্তোলন কমানোর খবরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। 

লম্বা সময় ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে শ্লথগতির কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রবৃদ্ধির হার কমছে। শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলো ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একের পর এক সুদহার বাড়চ্ছে। ফলে নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে জ্বালানি তেলের বাজার। দাম কমতে থাকায় বিপাকে পড়েছে জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমানোর মাধ্যমে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব, রাশিয়াসহ শীর্ষ উত্তোলক দেশগুলো। 

সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিকারক। দেশটি চলতি মাসে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল করে জ্বালানি তেল উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ সিদ্ধান্ত ছিল সাময়িক। অর্থাৎ বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু ওই মাসেই উত্তোলন কমানোর কথা ছিল। কিন্তু গতকাল দেশটি জানায়, আগস্টেও দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল করে উত্তোলন কমানো হবে। এর মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পণ্যটির সরবরাহ কমে আসবে, যা জ্বালানি তেলের দামের ওপর থেকে নিম্নমুখী চাপ কমাবে। ভারসাম্য ফিরবে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে। 

এদিকে সৌদি আরব এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পর পরই উত্তোলন ও রফতানি কমানোর ঘোষণা দেয় রাশিয়া। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক বলেন, ‘‌আগস্টে রাশিয়া দৈনিক পাঁচ লাখ ব্যারেল করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি কমাবে। একই পরিমাণে কমানো হবে উৎপাদনও। এর আগে মার্চে এককভাবে দৈনিক পাঁচ লাখ ব্যারেল করে উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাশিয়া।’ 

প্রসঙ্গত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় রদবদল পরিলক্ষিত হয়েছে। ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসনের অজুহাত দেখিয়ে রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে দেয়াই এর উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল রুশ জ্বালানি ও আর্থিক খাত। 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তার ওপর জি৭ভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে রুশ জ্বালানি তেলের ওপর প্রাইস ক্যাপ আরোপ করেছে। 

পাল্টা জবাব দিয়েছে রাশিয়াও। যেসব দেশ প্রাইস ক্যাপ চুক্তিতে অংশ নিয়েছে, সেসব দেশে অধ্যাদেশ জারি করে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপে মোটাদাগে জ্বালানি পণ্য বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে মস্কো। 

বিপরীতে এশিয়া, বিশেষ করে চীন ও ভারতে জ্বালানি তেল বিক্রি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে রাশিয়া। এসব দেশকে দেয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় মূল্যছাড়ের সুবিধা। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করছে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশি দামে জ্বালানিটি বিক্রি করছে বিভিন্ন উত্তোলক দেশ।