বিদেশী প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড দ্য ফ্রন্টিয়ার ফান্ডটির পোর্টফোলিওতে রহিমআফরোজ, রানার, অনন্ত অ্যাপারেল, বাটারফ্লাইয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। সহস্রাধিক কোটি টাকার এ পোর্টফোলিওটি কার্যত পরিচালনা করছে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেড। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতির কারণে তাদের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন অনেক দিনের। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া প্যারাডাইস পেপার্সে ফ্রন্টিয়ার ফান্ড ও ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের নাম উঠে আসায় স্বচ্ছতার প্রশ্নটি আরো জোরালো হলো।

করপোরেট অস্বচ্ছতা আর কর এড়ানোর উদ্দেশ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তের কোম্পানিগুলো বারমুডার মতো দেশগুলোয় ব্যবসা নিবন্ধন করে। গত এক দশকে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বড় অর্থনীতিগুলোর জোট থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্লাটফরম সবখানেই করস্বর্গগুলোর অপব্যবহার রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা আলোচনা হচ্ছে।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, করস্বর্গখ্যাত বারমুডায় নিবন্ধিত প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড দ্য ফ্রন্টিয়ার ফান্ড প্রায় এক দশক আগে কার্যক্রম শুরু করে। বিদেশী প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড হিসেবে এখন পর্যন্ত তারা স্থানীয় বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানিতে অন্তত ১০ কোটি ডলারের তহবিল বিনিয়োগ করেছে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত হালনাগাদ উপাত্তে দেখা যায়, রহিমআফরোজ গ্রুপের খুচরা বিক্রয় (রহিমআফরোজ সুপারস্টোরস লিমিটেড, আগোরা) ও ব্যাটারি ব্যবসার (রহিমআফরোজ গ্লোব্যাট লিমিটেড) যথাক্রমে ৪৯ ও ১৭ শতাংশ শেয়ার তাদের হাতে। প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান অনন্ত অ্যাপারেলস লিমিটেডের ১৪ শতাংশ শেয়ার কিনেছে ফান্ডটি। দেশের ইলেকট্রনিক ও অ্যাপ্লায়েন্স বাজারে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বাটারফ্লাই মার্কেটিং লিমিটেডের ২০ শতাংশেরও বেশি শেয়ার তাদের হাতে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আবেদন করা পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ২৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ডটি। স্থানীয় অটোমোটিভ শিল্পে অন্যতম প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলসেরও ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ শেয়ার তাদের হাতে। প্রাইভেট ইকুইটি ইনভেস্টমেন্টের সংস্কৃতি অনুযায়ী, এসব কোম্পানির পর্ষদে ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের প্রতিনিধি রয়েছেন।

প্রাইভেট ইকুইটি ও বিকল্প বিনিয়োগসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বড় পোর্টফোলিও পরিচালনা করলেও যৌথ মূলধনি কোম্পানি হিসেবে একটি নিবন্ধন ছাড়া দেশের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছেই দায়বদ্ধতা নেই ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের প্রকৃত তহবিল ব্যবস্থাপক ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট যুক্ত থাকলেও এ ব্যবসার জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে কোনো লাইসেন্সের আবেদন করেনি কোম্পানিটি। আবার বিদেশী তহবিল হওয়ায় প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ডটি পরিচালনার জন্যও স্থানীয় নিয়ন্ত্রকদের কোনো লাইসেন্স দরকার হচ্ছে না কোম্পানিটির।

এ বিষয়ে ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের উপদেষ্টা ও ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডের পরিচালক মোয়াল্লেম এ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স মূলত সুইডিশ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে পরিচালন কার্যক্রম চালানোর জন্য আমরা প্রায় এক দশক আগেই স্থানীয় কোম্পানি আইনের অধীনে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) নামে নিবন্ধিত হই। কোম্পানির নামের সঙ্গে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট রয়েছে ঠিকই। তবে আমরা এখনো প্রচলিত অর্থে সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু করিনি। এ কারণে বিএসইসির এএমসি (অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি) লাইসেন্সও প্রয়োজন হয়নি। আর প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ডটি (দ্য ফ্রন্টিয়ার ফান্ড) বারমুডায় নিবন্ধিত। সেখানে আইএফসি, সিডিসি, এফএমওর মতো উন্নয়ন সহযোগীদের বিনিয়োগ রয়েছে। স্থানীয় কোম্পানি হিসেবে আমরা অফশোর ফান্ডটিকে উপদেশ-পরামর্শটুকুই দিই। আমরা তাদের তহবিল ব্যবস্থাপনা করি না। এছাড়া ২০১৫ সালের বিকল্প বিনিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, অফশোর ফান্ড ম্যানেজমেন্টের জন্য স্থানীয় নিবন্ধনের আবশ্যকতাও নেই।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া প্যারাডাইস পেপার্সের এক অংশে দেখা গেছে, ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেড বারমুডায় নিবন্ধিত ফ্রন্টিয়ার ফান্ড (বারমুডা) লিমিটেডেরও শেয়ারহোল্ডার। এ বিষয়ে মোয়াল্লেম এ চৌধুরী বলেন, প্যারাডাইস পেপার্সের লিকসে কী এসেছে জানি না। তবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বারমুডাভিত্তিক ফ্রন্টিয়ার ফান্ডে এক পয়সাও বিনিয়োগ করেনি। ফান্ডের ইনিশিয়েটর হিসেবে সেখানে মূল ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের কিছু বিনিয়োগ থাকতে পারে।

ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশের কোম্পানি আইনে নিবন্ধিত হয়। এর পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক খালিদ কাদির। কোম্পানি নিবন্ধনের সময় তিনি ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করেছেন সিঙ্গাপুরের ব্যাটারি রোড। আরেক পরিচালক সুইডিশ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের এশিয়া উইংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আন্দ্রেস স্টেন্ডেবাকেন। যৌথ মূলধনি কোম্পানির নিবন্ধকের কার্যালয়ে তিনিও সিঙ্গাপুরের একই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। পর্ষদে তৃতীয় সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোয়াল্লেম এ চৌধুরী। তিনি ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স এবি নামের মূল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিটির পর্ষদে রয়েছেন। ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের বিনিয়োগ রয়েছে, এমন প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর পর্ষদে তাকেই বেশি দেখা যায়। তিনি ফান্ডেরও একজন উপদেষ্টা।

খাতসংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পরিচালনগত স্বচ্ছতা ও যথেষ্ট কর দেয়ার ভয়েই ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) নিজেদের শুধু স্থানীয় পরামর্শক হিসেবে উপস্থাপন করছে। কার্যত দ্য ফ্রন্টিয়ার ফান্ড নামের তহবিলটি তারাই ব্যবস্থাপনা করছে।

এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও বিএসইসির শীর্ষপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) হিসেবে অফশোর প্রাইভেট ইকুইটিকে স্বাগত জানানোই স্বাভাবিক। দেশের যেসব প্রাইভেট কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ নেয়, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনক্রমেই বৈদেশিক মুদ্রাগুলো গ্রহণ করে। এখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি নেই। কোন অফশোর ফান্ড কোন কোম্পানিতে কত বিনিয়োগ করছে, বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের কাছেও এর উপাত্ত থাকে। ফান্ডের মেয়াদ শেষে তারা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে কী পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে নেবে, এরও উপাত্ত থাকবে। আইন নির্ধারিত সুবিধার বেশি কেউই আদায় করতে পারবে না। তবে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ক্ষেত্রে সমস্যাটি হলো, তারা যে কলেবরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, স্বচ্ছতার স্বার্থে এর নিয়মিত আপডেট বিএসইসির কাছে থাকা প্রয়োজন।