কভিড-১৯ মহামারী-পরবর্তী সময়ে নানা অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে চীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রশাসন। এবার ২০২৪ সালের জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশটি। চলতি অর্থবছরে জিডিপিতে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় বেইজিং। গতকাল ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এ ঘোষণা দেন। খবর বিবিসি।
বক্তৃতাকালে চীনের অর্থনীতি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে স্বীকার করেন লি কিয়াং। তিনি বলেন, ‘এসব সংকটের অনেকগুলোর সমাধান হয়নি এখনো। আবাসন, স্থানীয় সরকারের ঋণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য বিপদগুলো কিছু অঞ্চলে তীব্র ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে ও কাজ করার ক্ষেত্রে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছি আমরা।’
কভিড-১৯ মহামারী থেকে মন্থর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় গতি আনতে সিরিজ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল চীন সরকার। এর মধ্যে দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত আবাসন খাতও অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন লক্ষ্যমাত্রায় শহরাঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলছে বেইজিং।
আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হবে বলেও জানান চীনা প্রধানমন্ত্রী। লি কিয়াং বলেন, ‘নতুন নতুন প্রযুক্তি গবেষণা বাড়ানো হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও লাইফ সায়েন্সের বিভিন্ন শাখায়।’
অর্থনীতি চাঙ্গা করার পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করার কথা জানান লি কিয়াং। চলতি বছর এ খাতে ব্যয় বেড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনা বেড়েছে। তাইওয়ান ঘিরে একাধিক মহড়ারও আয়োজন করেছিল বেইজিং।
চীনের অর্থনীতি কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে প্রসারিত হয়েছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, ওই সময় জিডিপি গড়ে ১০ শতাংশের কাছাকাছি হারে বেড়েছে। এমন প্রবৃদ্ধির অর্জন করার পথে জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয় শি জিনপিংয়ের চীন। বেইজিংয়ের দাবি, দেশটির অর্থনীতির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি কয়েক লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে।
বেইজিং বলছে, গত বছর চীনের অর্থনীতি ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছিল, যদিও এ স্তরকে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কমই মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে কিছু সমালোচক বলেছেন, প্রকৃত প্রবৃদ্ধি উল্লিখিত সংখ্যার চেয়ে এক-তৃতীয়াংশেরও কম হতে পারে।
চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্ট ক্যাপিটাল রিসার্চের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যান্ড্রু কোরিয়ার বলেছেন, ‘আমি মনে করি আগামী ৫-১০ বছর চীনের জন্য কঠিন হতে চলেছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, প্রবৃদ্ধির সংখ্যাগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট। ৫ দশমিক ২ বা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির ধারণাটি সম্ভবত ভুল। এটি বড়জোর ১ বা ২ শতাংশের মতো হতে পারে।’
চীনের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে আবাসন খাত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, দেশটি অর্থনীতিতে প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখে এ খাত। হ্যাং সেং ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড্যান ওয়াং বলেন, ‘আবাসন খাতের পতন আঞ্চলিক ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি বড় সমস্যা।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, পরিসংখ্যান সঠিক হোক কিংবা ভুল; এটা অন্তত স্পষ্ট হয়েছে যে বিশাল দেশ এবং এর নেতারা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের একটি ভয়ানক চক্রের মুখোমুখি হয়েছেন। এ তালিকায় রয়েছে সংকটময় আবাসান খাত, নড়বড়ে স্টক মার্কেট, কর্মক্ষম বেকার জনগোষ্ঠী ও ক্রমাগত ভোক্তামূল্য পতনের ফলে মূল্যস্ফীতির হুমকি। এছাড়া বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে শুরু করে চীনের নিম্নমুখী জন্মহার এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোকে প্রভাবিত করছে।










