করপোরেট খাতে দেউলিয়া হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়েই বেড়েছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। দুর্বল চাহিদা, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, ঋণগ্রস্ত ব্যালান্স শিট ও উচ্চতর ঋণ ব্যয়ের সংমিশ্রণ কখনো ঋণগ্রহীতাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলছে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কোম্পানির নির্বাহী ও ব্যবসার অংশীদাররা। ফলে বিশ্বজুড়ে করপোরেট ঋণখেলাপির উত্থানের নতুন ধারা শুরু হয়েছে, যা আরো ঘনীভূত হবে আগামী দিনগুলোয়। খবর দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।
২০১০ সালের পর এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের আওতাধীন কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে সবচেয়ে বেশি দেউলিয়া দেখেছে যুক্তরাষ্ট্রে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের করপোরেটগুলো ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দেউলিয়াত্বের সম্মুখীন। অন্যদিকে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেউলিয়া হয়েছে সুইডেনে। জার্মানিতে জুনে দেউলিয়া হওয়ার হার বছরে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০১৬ সালের পর সর্বোচ্চ। জাপানে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দেউলিয়ার ঘটনা ঘটেছে চলতি বছরে। সাধারণত মন্দা শুরু হওয়ার পরে দেউলিয়া হওয়ার বিষয়টি ত্বরান্বিত হয়। এক্ষেত্রে শ্রমবাজার ও করপোরেট মুনাফা আশ্চর্যজনকভাবে স্থিতিস্থাপক রূপে থাকলেও ব্যবসাগুলো ভেঙে পড়ছে।
উদার সরকারি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি ও দেউলিয়াজনিত নিয়মনীতিতে শিথিলতার কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে করপোরেট ব্যর্থতা দেখেছে দুনিয়া। ত্রুটিপূর্ণ ব্যবসায়িক মডেল ও সুবিধাযুক্ত মূলধন কাঠামো এবং বাধাগ্রস্ত শিল্প বর্তমানে ব্যাংকের সুদহারের বৃদ্ধি মোকাবেলায় প্রস্তুত নয়। ফলে পরিণতি এখন স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে। ভাইস-গ্রুপ অব হোল্ডিংয়ের মতো বেশ কয়েকটি কোম্পানি এরই মধ্যে বাইরের সংগ্রহ করা তহবিল শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে দেউলিয়ার পথে দাঁড়িয়ে। সর্বত্র দেউলিয়া হওয়ার প্রবণতা কোম্পানিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ব্যাপক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার দিক নির্দেশ করছে। ২০২১ সালের শেষ থেকে উচ্চ সুদহার ঋণদাতাদের নগদ প্রবাহ সীমাবদ্ধ হয়েছে। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা ২০০৮ সালের মতো ধাক্কার বদলে দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট আর্থিক দুর্দশার আশঙ্কা করছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের রাখার চেষ্টায় উচ্চমাত্রার সুদহার বহাল থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। ছোট কোম্পানিগুলো বিশেষ করে যাদের ফ্লোটিং-রেটে ঋণ আছে, তারা ব্যাংক ঋণের ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। পাশাপাশি উচ্চতর ঋণ ব্যয়ের প্রভাব দ্রুত অনুভব হবে আগামী দিনগুলোয়। বেড বাথ অ্যান্ড বিয়ন্ড ও কিকা বা লেইনারের মতো বড় কোম্পানিগুলো এরই মধ্যে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি এমন ঝুঁকি বাড়িয়েছে, যেখানে সরবরাহকারীরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য অর্থ পাবে না, শ্রমিকরা তাদের চাকরি হারাবে এবং ব্যাংকের ঋণের মানদণ্ড আরো কঠোর হবে। এমনকি প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতগুলো এ ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। তারাও ফ্লোটিং-রেটের ঋণ ও জামানতযুক্ত ঋণের বাধ্যবাধকতার কারণে বাজার সংকোচন আর চাপ বাড়াচ্ছে।
মার্কিন জাঙ্ক বন্ড আগে ৪ শতাংশের নিচে ছিল, এখন তা প্রায় ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের বন্ডগুলোর সঙ্গে যুক্ত উচ্চঝুঁকির জন্য পর্যাপ্তভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যেহেতু সুদহার শিগগিরই আগের স্তরে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই, তাই ব্যবসাগুলো তাদের ঋণ পুনঃঅর্থায়নের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ফলে কেউ কেউ ভবিষ্যতের সমস্যাগুলো কম করার জন্য সক্রিয়ভাবে ঋণ পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এটি আর্থিক উপদেষ্টা ও করপোরেট আইনজীবীসহ অন্যদের সুযোগ করে দিয়েছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি এ করপোরেট সংকটের কেবল শুরু হয়েছে মাত্র, যা ব্যবসা ও বৃহত্তর অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ।










