দেশে এক বছরের ব্যবধানে ব্যবসায়িক পরিবেশের আরো অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স ২০২৩-২৪ (বিবিএক্স) প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই) কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের ব্যবসা পরিবেশ সূচক ৫৮ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে নেমেছে, যা এর আগের অর্থবছরে ছিল ৬১ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সূচকমান কমেছে ৩ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট। এর মধ্যে অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং ব্যবসা শুরুর সূচকে অবনতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যবসা শুরু, জমির প্রাপ্যতা, আইনি তথ্যপ্রাপ্তি, অবকাঠামো, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বিরোধ নিষ্পত্তি, বাণিজ্য ‍সুবিধা, কর পরিশোধ, প্রযুক্তি সংযোজন, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ ও মানের ওপর ভিত্তি করে জরিপটি করা হয়েছে। 

এবারে জরিপে দেখা গেছে, এ ১১টি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ করেছে অর্থায়নে প্রবেশাধিকার সূচকে। এ সূচকমান নেমেছে ২৮ দশমিক ১১ পয়েন্টে। গত বছরের জরিপে বলা হয়েছিল, ব্যবসায়ীদের অর্থায়নের বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করেছে। এবারের জরিপেও তার ধারাবাহিকতা দেখা গেল।

কৃষি ও বনায়ন, নির্মাণ, ইলেকট্রনিকস ও হালকা প্রকৌশল, আর্থিক মধ্যস্থতাকারী, খাদ্য ও পানীয়, চামড়া ও ট্যানারি, ওষুধ ও রাসায়নিক, আবাসন, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, পরিবহন, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা—মোট ১২টি খাতের ওপর জরিপটি করা হয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে সামগ্রিকভাবে ব্যবসার পরিবেশ সূচক ছিল ৬১ দশমিক ১ পয়েন্ট। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৬১ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দাম বাজারের ওপরে ছেড়ে দিয়েছে। এখন ডলার রেট ১১৭-তে চলে এসেছে। ফলে ডলার সংকট কিছুটা কাটছে। আমাদের মূল্যস্ফীতির সমস্যা আছে, যার কারণে সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। আমরা আশাবাদী জুলাই থেকে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করবে।’

সালমান এফ রহমান বলেন, ‘এ বাজেটে নতুন ধরনের সংস্কার আসবে। ট্যাক্স যারা দিচ্ছে, তাদের কাছ থেকে কীভাবে আরো ট্যাক্স আদায় করা যায়, সে বিষয়টি চিন্তা করা দরকার। আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত গত বছরের তুলনায় কমেছে। এটা আমাদের জন্য একটি সমস্যা। এ সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ দরকার। অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে বিডা কাজ করছে। এ সরকার সবসময় ব্যবসাবান্ধব। আমাদের পুঁজিবাজার আরো শক্তিশালী থাকা দরকার। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, এক্সচেঞ্জ কমিশন সবার সঙ্গে কথা বলছি। প্রধানমন্ত্রীও চাচ্ছেন, আমাদের পুঁজিবাজারকে আরো শক্তিশালী করতে। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে আমাদের যা প্রয়োজন তা করতে হবে।’

সভাপতির বক্তব্যে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘আমরা একটি সংকটময় অবস্থায় রয়েছি। এ মুহূর্তে আমাদের পলিসি নির্ধারণ, উদ্ভাবন, ইকোসিস্টেম প্রস্তুত এবং উদ্যোক্তা তৈরির পথ মসৃণ করতে হবে। যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা উন্নতি ও স্থায়িত্বের উদাহরণ তৈরি করতে পারব।’ 

মূল প্রবন্ধে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমরা তিন বছরের ডাটা বিশ্লেষণে ছয়টি পিলারে মিশ্র ফলাফল পেয়েছি। ভূমি প্রাপ্তি, প্রযুক্তির সংযোজন এবং বাণিজ্য সুবিধার ক্ষেত্রে ক্রমাগত উন্নতি হয়েছে। অন্য সবগুলো পিলারের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে।’

বিভাগগুলোর ব্যবসায়িক পরিবেশ উল্লেখ করে মাসরুর বলেন, ‘বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকা ও রাজশাহী ভালো করছে। কিন্তু তাদের স্কোর খুব বেশি নয়। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ঢাকা ভালো করেছে। কিন্তু অন্যান্য বিভাগের তুলনায় খুব বেশি উন্নতি হয়নি। চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক পরিবেশ ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। অন্য বিভাগগুলোর ব্যবসায়িক পরিবেশ মিশ্র অবস্থায় রয়েছে।’ 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, ‘বিডা বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে কাজ করছে। এর জন্য ব্যবসায়ীদের থেকে আসা পরামর্শকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।’ 

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি জাভেদ আখতার বলেন, ‘আমাদের উদ্ভাবন করতে হবে, কীভাবে একটি নতুন কোম্পানিকে সুযোগ করে দেয়া যায় এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়। আমাদের দেশে যখন নতুন একটা কোম্পানি প্রকাশ্যে আসে, তখন ১৫০-এর বেশি অনুমোদন নেয়ার জন্য আমাদের প্রায় ২৩-৩০টি এজেন্সির কাছে যেতে হয়। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাজ্যে কোম্পানি চালু করা খুবই সহজ। দ্বিতীয়ত, এখানে কর ব্যবস্থা খুবই জটিল। কর ব্যবস্থাকে সহজতর করার জন্য এনবিআরকে উদ্যোগ নিতে হবে।’ 

এমসিসিআইয়ের সেক্রেটারি জেনারেল ফারুক আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের বাংলাদেশের প্রতিনিধি ইউজি আন্দোসহ আরো অনেকে।