কয়লার ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে চীন। চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উত্তোলন দিয়ে পূরণ করত দেশটি। কিন্তু দেশটির নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে গত কয়েক বছর জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন বেশ সীমিত হয়ে এসেছে। এ খাতে নতুন বিনিয়োগ কমেছে। অন্যদিকে কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফিরেছে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে হু হু করে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ খাতে চাহিদা মোকাবেলায় কয়লা আমদানিতে জোর দিচ্ছে চীন। বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে যেকোনো মূল্যেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কয়লা আমদানি করতে চায় বেইজিং। এতে কয়লার বৈশ্বিক বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য ভোক্তা দেশগুলোর জন্য ক্রমে হুমকি হয়ে উঠছে চীনের নজিরবিহীন এ আমদানিপ্রবণতা।
বিশ্বব্যাপী কভিড-পরবর্তী শিল্প উৎপাদন কার্যক্রম বেগবান হচ্ছে। বাড়ছে বিদ্যুতের ব্যবহারও। এতে চাঙ্গা হয়ে উঠছে জ্বালানি পণ্যের দাম। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে এলএনজির দাম এখন সর্বোচ্চে। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে জ্বালানি তেলের বাজারও। এ অবস্থায় চাহিদা মোকাবেলায় কয়লার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে বেশির ভাগ দেশ। অন্যদিকে জ্বালানিটির প্রধান উৎপাদক দেশগুলো থেকে চলছে সরবরাহ সংকট। এরই মধ্যে আগ্রাসীভাবে আমদানি বাড়াচ্ছে চীন। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ দামে কয়লা কিনতে প্রস্তুত রয়েছে দেশটি। এতে জ্বালানি পণ্যটির বাজারে তৈরি হয়েছে অসম প্রতিযোগিতা। বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে কয়েক বছর ধরে কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনার চেষ্টা করছিল অনেক দেশ। বিপরীতে চাহিদা বাড়ছিল এলএনজি, প্রাকৃতিক গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির। ফলে অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের বাজারে বেশ পিছিয়ে ছিল কয়লা। কভিড পরিস্থিতি তা আরো নাজুক করে দেয়। তবে কভিড-পরবর্তী শিল্পোৎপাদন কার্যক্রম ও শীত মৌসুম কেন্দ্র করে জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা এখন ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে। আর বাজার চাঙ্গা করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে চীন। দেশটির প্রধান কয়লা উত্তোলন অঞ্চলগুলোতে মজুদ কমেছে। বিপরীতে চাহিদা সর্বোচ্চে। এ অবস্থায় কয়লা সরবরাহ ও মজুদ বাড়াতে জোরেশোরে কাজ করছে দেশটি। বিদ্যুৎ উৎপাদক কোম্পানিগুলো আমদানিকারকদের যেকোনো মূল্যে অধিক পরিমাণ কয়লা আমদানির জন্য চাপ দিচ্ছে।
চায়না ইলেকট্রিসিটি কাউন্সিলের সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতেও কয়লা সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিজেদের একাট্টা মনোভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়, চীন যেকোনো মূল্যে কয়লা সংগ্রহের পরিধি বাড়াবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে যেকোনো দাম দিতেই প্রস্তুত তারা।
কয়লা আমদানিতে চীন এতটা মনোযোগী হওয়ার মূল কারণ অভ্যন্তরীণ উত্তোলন সংকট। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলছে, কার্বন নির্গমণ কমিয়ে আনতে কয়েক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ উত্তোলন কমিয়ে আনছিল দেশটি। ফলে অনেক খনিতে নতুন করে বিনিয়োগ করা হয়নি। এ কারণে সর্বোচ্চে চাহিদা থাকলেও অল্প সময়ে উত্তোলন বাড়ানো সম্ভব না।
অন্যদিকে কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে চীনের অন্যতম উৎস ছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ক্যানবেরার সঙ্গে সম্প্রতি বাণিজ্যিক বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে বেইজিং। এ কারণে উৎসটি থেকে আমদানি বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো অন্যতম উত্তোলক দেশগুলোতে ভারি বর্ষণের কারণে উত্তোলন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার নীতিগত কারণে অনেক দেশ কয়লা খনির সংখ্যা কমিয়ে আনছে। সবুজ অর্থায়নের কারণে এ খাতে ঋণ দেয়া বন্ধ করছে ব্যাংকও। ফলে চাহিদার বিপরীতে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন সীমিত হয়ে আসছে। একই কারণে চীনের বিদ্যুৎ কোম্পানি ও খনিগুলোতেও মজুদ কমে আসছে। মরগ্যান স্ট্যানলির সাম্প্রতিক এক নোটে বলা হয়েছে, চীনের প্রধান ছয়টি বিদ্যুৎ উৎপাদক কোম্পানির কয়লার মজুদ গত বছরের তুলনায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে, মৌসুম হিসেবে যা ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন। এ অবস্থায় স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) প্রতিষ্ঠানগুলোও কয়লার সরবরাহ ও মজুদ বাড়াতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে। আগস্টে থার্মাল কোলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বেড়েছে ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে কয়লার উত্তোলন বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। আর জুনের পর থেকে আমদানি বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন বলছে, চীন এখন রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে কয়লা আমদানি বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত ৪৪ লাখ টন থার্মাল ও কোকিং কোল আমদানি করেছে দেশটি। যেখানে ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশটি থেকে আমদানি শূন্য ছিল। অন্যদিকে ইউরোপের অন্যতম সরবরাহকারী রাশিয়া থেকেও কয়লা আমদানি দ্বিগুণ করেছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বেড়েছে সাতগুণেরও বেশি।
আর চীনের আগ্রাসী আমদানি প্রবণতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম বাড়ছে। ইউরোপের বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম ১৩ বছরের সর্বোচ্চে। অস্ট্রেলিয়ান নিউক্যাসেলে গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় কয়লার দাম বেড়েছে ২৫০ শতাংশ।
কয়েক মাস আগেও চীনের ক্রেতারা স্পটমার্কেট থেকে কয়লা কিনতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সুর বদলে এখন তারা আরো অধিক পরিমাণ কয়লা আমদানি করতে চান। এমনকি চাহিদা মোকাবেলায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কঠোর বাধা-নিষেধেও শিথিল করতে প্রস্তুত বেইজিং।










