রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক। কিন্তু দেশটি সম্প্রতি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে ব্যবহারিক ধাতুটির সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। খবর এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটস।
বাজার পর্যবেক্ষকরা জানান, অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন পুরোপুরিভাবেই জ্বালানিনির্ভর। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চে উঠে আসে। জ্বালানি পণ্যের এমন মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইউরোপের অনেক বিগলন প্রতিষ্ঠানই অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে আনছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাবে রাশিয়ার অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সক্ষমতাও কমতে পারে।
এদিকে শুধু অ্যালুমিনিয়ামই নয়, ধাতুটির কাঁচামাল নিকেলের বাজারও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। অ্যালুমিনিয়ামের মজুদ ও চীনে রফতানি প্রবাহ নিয়ে আশঙ্কার পারদ ভারী হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সাংহাই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে গত বৃহস্পতিবার নিকেলের সরবরাহ চুক্তি হয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে।
সাংহাই ফিউচারস এক্সচেঞ্জের তথ্যানুযায়ী, এপ্রিলে সরবরাহ চুক্তিতে প্রতি টন নিকেলের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৯৬ ডলার ৮০ সেন্টে। একদিনের ব্যবধানে দাম বাড়ল ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এছাড়া এক বছরের ব্যবধানে ধাতুটির মূল্য ২৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে এপ্রিলে সরবরাহ চুক্তিতে অ্যালুমিনিয়ামের দাম বিপত্সীমার ওপরে অবস্থান করছে। প্রতি টনের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৯৫০ ইউয়ানে। একদিনের ব্যবধানে ধাতুটির দাম বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ।
ইউরোপের দেশগুলো বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতির কারণে চলতি বছর শুরুর পর এ অঞ্চলের প্রাইমারি অ্যালুমিনিয়াম বিগলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সরবরাহ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এতে ধাতব পণ্যটির দাম কয়েক সপ্তাহ ধরে অব্যাহতভাবে বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ চেইনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। এসব পূর্বাভাসের কারণে লাফিয়ে বাড়ছে দাম। জ্বালানি সংকটের ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে ইউরোপের বিগলন প্রতিষ্ঠানগুলো অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন কমাচ্ছে। অনেক ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান উৎপাদন একেবারেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
রাশিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রুসাল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক। বৈশ্বিক সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র রুসালের উৎপাদন কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পরই ভয়াবহ সংকট দেখা দেয় ধাতুটির বৈশ্বিক বাজারে। ওই সময় অ্যালুমিনিয়ামের বৈশ্বিক দাম সাত বছরের সর্বোচ্চে আরোহণ করে। এর পর থেকে পরিশোধন ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে অব্যাহতভাবে। রুসালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত বছর কোম্পানিটি সব মিলিয়ে ৩৭ লাখ ৬০ হাজার টন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন করে।
এদিকে ইউরোপের বিগলন প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমিয়ে দেয়ায় ধাতব পণ্যটির আমদানি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এ কারণে চীনের বিভিন্ন বাজারে পণ্যটির আমদানির পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাংহাই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে প্রধান সরবরাহ পণ্য নিকেল। কিন্তু অঞ্চলটিতে চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে সাংহাই ফিউচারসের মজুদাগারগুলোয় অ্যালুমিনিয়াম স্বল্পতা আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
তথ্য বলছে, ১৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়া সপ্তাহে মজুদাগারগুলোয় পরিশোধিত নিকেলের মজুদ ছিল ১৬ হাজার টন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মজুদ কমেছে ১ হাজার ৩০০ টন। এর মধ্য দিয়ে মজুদ ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমেছে।
চীনের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ধাতব পণ্যের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যানেইক জানায়, চলতি বছর চীনের বাজারে নিকেলের চাহিদা বেড়ে ১৬ লাখ ৫৫ হাজার টনে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় চাহিদা বাড়বে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি বছর নিকেলের বৈশ্বিক চাহিদা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। চাহিদার পরিমাণ দাঁড়াবে ৩০ লাখ ৫০ হাজার টনে।










