অতিমারী, ইউক্রেন যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির পর বিশ্ব অর্থনীতি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যেতে একটি নেতিবাচক ধাক্কাই যথেষ্ট। রাশিয়ার বিক্ষুব্ধ আধাসামরিক ভাড়াটে বাহিনী মস্কোর দিকে অগ্রসর হওয়ার ঘটনা সেটাই প্রমাণ করে। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাজনৈতিক অরাজকতার জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সশস্ত্র অভ্যুত্থান আপাতত নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তবে ২৩ বছরের মধ্যে পুতিনের কর্তৃত্বের জন্য এটি হতে পারে সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ, যা পরবর্তী অশান্তি ও পরিবর্তনকে উস্কে দিতে পারে। খবর সিএনএন।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাশিয়া সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ জেফরি সোনেনফেল্ড বলেন, ‘পুতিনের শাসন এখন পুরোপুরি বিশৃঙ্খলার মধ্যে আছে।’ এরই মধ্যে রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ ১০টি অর্থনীতির তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। যেখানে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় অস্ট্রেলিয়ার সমান। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সত্ত্বেও রাশিয়া এখনো চীন ও ভারতসহ বিশ্ববাজারে অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি সরবরাহকারী। কাতার রাশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
রাশিয়ার জ্বালানি ক্ষেত্রে অর্থবহ কোনো প্রকার পরাজয় চীন ও ভারতকে অন্যান্য উৎপাদকের কাছ থেকে সরবরাহের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করবে। যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা শস্য বা সারের মতো অন্যান্য পণ্যের রফতানিকে সীমাবদ্ধ করে, তাহলে তা সরবরাহ ও চাহিদাকেও বিঘ্নিত করতে পারে। ফলে জিনিসপত্রের দাম আরো বেড়ে যেতে পারে। আমেরিকার প্রধান তেল বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা কেবল অনিশ্চয়তা নিয়ে এসেছে, যা বাজারে উচ্চমূল্যের মাধ্যমে প্রতিফলিত হতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় আমরা দেখেছি, এ ধরনের উত্থান ও অনিশ্চয়তায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি বাজারের সৃষ্ট উদ্বেগের কারণে দামে এক প্রকারের পরিবর্তন আসতে পারে।’
ইউক্রেন আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। ফলে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। বহু দশকের চাপ থেকে পতন ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু দাম নিয়ন্ত্রণের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, মূল্য স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের যাত্রাটি কঠিন হবে। মূল্যস্ফীতির মনস্তত্বে বস্তুগত যে ঝুঁকি রয়ে যাবে, তাকে অর্থনীতিবিদরা মজুরি-মূল্যের চক্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিশ্ব অর্থনীতি একটি সংকটময় সময়ের মধ্যে রয়েছে। জেনারেল ম্যানেজার অগাস্টিন কার্স্টেনস বিআইএসের বার্ষিক সাধারণ সভায় বলেন, ‘কঠোর চ্যালেঞ্জগুলো অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে।’
অর্থনীতির ধীরগতির কারণে চলতি বছর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি চাহিদা বেশ দুর্বল হতে পারে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের নিচে নেমেছে। নিচে নেমেছে আন্তর্জাতিক বাজারেও।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে রাশিয়ার সরবরাহ অব্যাহত রাখার সক্ষমতা বিপন্ন করতে পারে, এমন যে কোনো কিছুকে পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা ও এশিয়ার বৃহত্তম গ্রাহক উদ্বিগ্নভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। যদিও রাশিয়া জ্বালানির মাঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। প্রতিদিন মাত্র এক কোটি ব্যারেল দিয়ে এটি বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ১০% উৎপাদন করে থাকে। প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করে দেশটি। ওপেক জোটে সৌদি আরবের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি উৎপাদনকারী হিসেবে অবস্থান করছে।










