পরপর কিছু নিরাপত্তা কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হলেও মাঝ আকাশে দরজার প্লাগ খুলে পড়ার ঘটনায় বেশি বিপত্তিতে পড়ে বোয়িং। একাধিক তদন্তের মুখোমুখি হয় প্রতিষ্ঠানটি। মূলত স্পিরিট অ্যারোসিস্টেমসের সরবরাহ করা ত্রুটিপূর্ণ বডির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এখন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি কেনার জন্য দর কষাকষি করছে এ উড়োজাহাজ নির্মাতা জায়ান্ট। খবর সিএনএন।
স্পিরিট অ্যারোসিস্টেমসের সঙ্গে বোয়িংয়ের মালিকানা সম্পর্ক নতুন নয়। একসময় যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি বোয়িংয়ের অংশ ছিল। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৯০ কোটি ডলারে বিক্রি হয়ে যায়। কানসাসভিত্তিক স্পিরিট অ্যারোসিস্টেমস ৭৩৭ ম্যাক্সসহ বোয়িংয়ের সর্বশেষ কিছু মডেলের ফিউজলেজ ও অন্য কিছু প্রধান অংশ তৈরি করে। সেখান থেকে যন্ত্রাংশগুলো রেলের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের বোয়িং কারখানায় পাঠানো হয়।
সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বোয়িং জানায়, ক্রয় চুক্তির বিষয়ে তারা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে উড়োজাহাজে নিরাপত্তা জোরদার, গুণমানে পরিমার্জন এবং গ্রাহক, কর্মচারী ও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য উৎপাদন কার্যক্রমকে পুনঃসংহত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দুই প্রতিষ্ঠান।
সাম্প্রতিক সুরক্ষা বিঘ্নের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) তদন্তের মুখোমুখি হয়েছে বোয়িং। মান নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা জানাতে জায়ান্টটিকে ৯০ দিন সময়ও বেঁধে দেয়া হয়েছে। এমন সময় স্পিরিট অ্যারোসিস্টেমের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি সামনে এল। সাম্প্রতিক আয়ের হিসাবে জানা যায়, বোয়িংয়ের সরবরাহের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল স্পিরিট। গত বছর বোয়িং থেকে ৩৯০ কোটি ডলার আয় করে স্পিরিট, যা তাদের মোট আয়ের ৬৪ শতাংশ। এ হিসাবে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য স্পিরিটকে অধিগ্রহণ লাভজনক হতে পারে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতার মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সের এয়ারবাস, যারা স্পিরিটের পাখা তৈরির প্লান্ট কিনে নিতে এরই মধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একাধিক মান নিয়ন্ত্রণ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে স্পিরিট। এজন্য তাদের অতিরিক্ত তহবিলও দিয়েছে বোয়িং, যার বদৌলতে ২০২১ সালে ৬ কোটি ডলার পেয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সাল নাগাদ এ অংক হবে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
স্পিরিটের সঙ্গে বোয়িংয়ের চুক্তি উৎপাদন চেইনে নিয়ন্ত্রণ এনে দেবে আশা করা হলেও অনেকেই মনে করছেন, অধিগ্রহণ পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত ভুল। কারণ নিজেদের ওপর থাকা চাপের সঙ্গে স্পিরিটের ত্রুটি ঠিক করতে বোয়িংকে দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এছাড়া অধিগ্রহণ বাবদ কাঁধে চাপতে পারে বাড়তি ঋণের বোঝা।
এদিকে ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড জানিয়েছে, জানুয়ারিতে আলাস্কা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের দরজার প্লাগ উড়ে যাওয়ার ঘটনায় বোয়িং কারখানার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে স্পিরিট অ্যারোসিস্টেমস থেকেই সমস্যা নিয়ে এসেছিল ফিউজলেজ। তাই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত দায় বোয়িংয়ের হলেও স্পিরিটের গুণগত মানের সমস্যা একে প্রভাবিত করেছিল। এর আগে ২০২৩ সালে স্পিরিট অ্যারোসিস্টেমস মান নিয়ন্ত্রণে অবহেলা করায় ৭৩৭ ম্যাক্স জেটের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এদিকে স্পিরিটের অধিগ্রহণের খবর শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত শুক্রবার কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ে ১৫ শতাংশ। অবশ্য জানুয়ারির শুরুতে আলাস্কা এয়ারলাইনসের ঘটনার পর থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শেয়ারদরে পতন ছিল ১০ শতাংশ। তবে শেয়ারদরে সবচেয়ে পতন ঘটে ২০১৯ সালের মার্চে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স দুর্ঘটনার পর। ওই সময় প্রায় ৭০ শতাংশ পতন হয়েছিল। তখন ২০ মাসের মতো আকাশে ওড়েনি বোয়িং। অন্যদিকে জানুয়ারির দুর্ঘটনার পর বাতিল হয় কয়েকশ ফ্লাইট।
চলন্ত অবস্থায় প্যানেল খুলে যাওয়া ছাড়াও সম্প্রতি ৭৩৭ ম্যাক্স নাইন উড়োজাহাজের জানালায় ফাটল এবং অন্য একটি ফ্লাইটের ইঞ্জিনে আগুন লেগে যায়। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে জানুয়ারিতে বোয়িং উড়োজাহাজের অর্ডার ও ডেলিভারি কমেছে। বোয়িং গত মাসে ২৭টি উড়োজাহাজ সরবরাহ করেছে, যা সেপ্টেম্বরের পর থেকে সর্বনিম্ন। এছাড়া বোয়িং ম্যাক্স উড়োজাহাজ বিক্রি করেছে তিনটি। তবে অন্য তিনটি বিক্রি বাতিলও হয়েছে কোম্পানিটির। অন্যদিকে বোয়িংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাস জানুয়ারিতে ৩০টি উড়োজাহাজ সরবরাহ করেছে। বোয়িং কর্তৃপক্ষ চলতি মাসের শুরুতে জানায়, ভুলভাবে ড্রিল করা গর্তের কারণে প্রায় ৫০টি ম্যাক্স উড়োজাহাজে সংস্কার করতে হবে।










