রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে জ্বালানি পণ্যের বাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী। সরবরাহ সংকটের শঙ্কায় প্রায় সব জ্বালানি পণ্যের দাম রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে কয়লার দামও। উপরন্তু রাশিয়া থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সরবরাহ না হওয়ায় বাজার আরো চাঙ্গা হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ক্রেতারাও এখন রাশিয়ার পরিবর্তে ইন্দোনেশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি।
ইন্দোনেশিয়া থার্মাল কয়লার শীর্ষ রফতানিকারক দেশ। তবে অভ্যন্তরীণ বাজার চাহিদা মোকাবেলায় রফতানিকারকদের ওপর সরকারের পক্ষ থেকে এক ধরনের চাপ রয়েছে। এজন্য জ্বালানি পণ্যটির রফতানিতে কিছুটা বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার রেকর্ড দাম হওয়ায় পণ্যটির রফতানি বাড়াতে চায় ইন্দোনেশিয়া। এজন্য কয়লা উত্তোলক কোম্পানিগুলো উত্তোলন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে কয়লা বাণিজ্য থেকে আয় বাড়াতে সরকারও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে যাচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে গত সপ্তাহে কয়লার দাম টনপ্রতি ৪৫০ ডলার ছাড়িয়েছে। যেখানে গেল অক্টোবরে সর্বোচ্চ ২৬৯ ডলারে পৌঁছায়। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যটির সরবরাহ বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হচ্ছে। ক্রেতা দেশগুলোর রাশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়ামুখী হওয়ার প্রবণতা দেশটির জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে।
তার আগে অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়ান কোল মাইনিং অ্যাসোসিয়েশন (এপিবিআই)। সংস্থাটি বলছে, তারা দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়। এজন্য সরকারের সঙ্গে কাজ করছে তারা।
এপিবিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হেন্দ্রা সিনাডিয়া বলেন, তারা অভ্যন্তরীণ চাহিদা মোকাবেলায় পর্যাপ্ত কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদক ও বিতরণকারী সংস্থা পিএলএনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এপিবিআইয়ের সদস্যরা চুক্তি অনুসারে পিএলএনের কাছে কয়লা বিক্রি করবে। দেশে বিদ্যুতের সংকট যেন প্রকট না হয়, এজন্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হবে। পাশাপাশি কয়লা বাণিজ্যের বিষয়টি নিয়ে তদারকি করা সংস্থা সিমবারা ও কোল বিএলইউর সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
অভ্যন্তরীণ বাজারে কয়লা সংকট হওয়ায় জানুয়ারিতে রফতানি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইন্দোনেশিয়া। পরবর্তী সময়ে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। এর পরিবর্তে দেশীয় বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে কোটা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন করে রফতানি প্রাক্কলনও করে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী, চলতি বছরে ৬৬ কোটি ৩০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করবে দেশটি। আগের বছরের তুলনায় যা ৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করতে হবে। সেই হিসাবে চাহিদা মেটাতে এ বছর ১৬ কোটি ৬০ লাখ টনের মতো কয়লা নিজ দেশের বাজারেই বিক্রি করতে হবে। আর সম্ভাব্য রফতানি ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৭০ লাখ টন।
বিশ্বে থার্মাল কয়লার সবচেয়ে বড় রফতানিকারক ইন্দোনেশিয়া। এরপরই রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়া। দেশটির কয়লার বেশির ভাগেরই গন্তব্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। অন্যদিকে রাশিয়ার কয়লার অন্যতম গন্তব্য পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপ। কিন্তু যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার প্রচলিত বাজার থেকেও ক্রেতা ইন্দোনেশিয়ামুখী হচ্ছে। যেটিকে দেশটির জন্য একটি বড় সুযোগ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজারবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির প্রধান বিশ্লেষক রোরি সিমিংটন সম্প্রতি নিক্কেই এশিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বিদ্যমান বাজারগুলোয় ইন্দোনেশিয়ার জন্য এখন বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা এরই মধ্যে ক্রেতাদের মধ্যে নতুন বাজার সন্ধানের চাপ তৈরি করেছে।
ইউরোপের নতুন ক্রেতারাও কয়লা আমদানির জন্য এখন ইন্দোনেশিয়ামুখী হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এপিবিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হেন্দ্রা সিনাডিয়াও। তিনি বলেন, নতুন ক্রেতারা কয়লা আমদানি করতে তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটা তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা। রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে তারা ইন্দোনেশিয়াকে বেছে নিচ্ছেন। তবে উত্তোলক ও রফতানিকারক দেশগুলোয় আগে তাদের কোটা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে বলেও জানান তিনি।










