২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ চুক্তিতে সম্মত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি। বৈশ্বিক আর্থিক বাজার অবকাঠামো ও তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলএসজির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

এলএসজি জানিয়েছে, ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তথাকথিত ‘মেগাডিল’ বা বৃহৎ চুক্তিতে সম্মত হওয়ার সংখ্যা এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সফটওয়্যার খাতের দরপতনকে উপেক্ষা করেই বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ ও বড় কোম্পানিগুলোর বাজার দখলের আগ্রাসী মনোভাবই এসব চুক্তির মূল কারণ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে গত তিন মাসে মোট ২২টি মেগাডিল সম্পন্ন হয়েছে। এটি এ-যাবৎকালের যেকোনো প্রান্তিকের জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর আগে ২০১৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে সর্বোচ্চ ২১টি মেগাডিল হয়েছিল। পাশাপাশি এ নিয়ে টানা তিনটি প্রান্তিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন দেখল বিশ্ব অর্থনীতি।

ল ফার্ম ডিএলএ পাইপারের এমঅ্যান্ডএ চেয়ারম্যান ভিক্টর সাপেজনিকভ এ পরিস্থিতিকে ‘চরম ব্যস্ত সময়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, গত বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক ব্যবস্থা ঘোষণার পর কোম্পানিগুলোর মধ্যে ঝুঁকি এড়ানোর মানসিকতা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু তার কোনো ছিটেফোঁটাও এখন আর নেই।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ব্যবসায়িক একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের দৌড়ে বরাবরের মতোই শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে প্রায় ৬২ হাজার ৯৮০ কোটি ডলারের লেনদেন হয়েছে। এ সংখ্যা ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকের ঐতিহাসিক ৬৩ হাজার কোটি ডলারের রেকর্ড ছোঁয়ার ঠিক কাছাকাছি অবস্থান করেছে। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে মহামারী-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি ব্যবসায়িক উন্মাদনাই ছিল এমঅ্যান্ডএ খাতের স্বর্ণ সময়।

গিবসন ডানের এমঅ্যান্ডএ বিভাগের সহপ্রধান জর্জ সাম্পাস জানান, বর্তমানে কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা কয়েক মাস আগের তুলনায় এখন কিছুটা কম আশাবাদী হলেও তারা বর্তমান মার্কিন প্রশাসনকে বৃহৎ চুক্তির ক্ষেত্রে বেশ সহায়ক হিসেবে দেখছেন।

বেশকিছু বড় চুক্তির খবর সামনে এসেছে মার্চের শেষ দিনগুলোয়। যেমন ইউনিলিভারের খাদ্য বিভাগ ও ম্যাককরমিকের একীভূত হওয়া, খাদ্য পরিবেশক কোম্পানি সিসকোর ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পাইকারি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান জেট্রো রেস্টুরেন্ট ডিপো কিনে নেয়া, এআই তৈরি ওষুধ বাজারজাতে ইনসিলিকোর সঙ্গে এলি লিলির ২৭৫ কোটি ডলারের চুক্তি এবং গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনারস ও ইকিউটির ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এইএস অধিগ্রহণ। অন্যদিকে ডেভন এনার্জি ও কোটেরা এনার্জির একীভূতকরণের ফলে তৈরি হয়েছে ৬ হাজার কোটি ডলারের এক বিশাল তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান গ্রুপ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইউরোপীয় বাজারেও লেনদেনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গত প্রান্তিকে ইউরোপে চুক্তি সম্পাদনের হার ৮২ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শতবর্ষী ব্রিটিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান শ্রোডারস বিক্রি হওয়া। মার্কিন ফান্ড ম্যানেজার কোম্পানি নুভিন ৯৯০ কোটি পাউন্ডের বিনিময়ে কোম্পানিটি কিনে নেয়।

রেকর্ড পরিমাণ চুক্তি হলেও সামনের দিনগুলোয় বেশকিছু চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশ্লেষকরা। যেমন এক. জ্বালানি তেলের দাম; মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন আকাশচুম্বী। পেট্রল পাম্পে উচ্চমূল্যের প্রভাব এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এসে পড়েনি। কিন্তু সামনের দিকে এর প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে ধীরগতি তৈরি করতে পারে। দুই. প্রযুক্তি খাতের মন্থর প্রবৃদ্ধি; এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব ও সফটওয়্যার খাতের স্টক বা শেয়ারের দরপতন বৈশ্বিক চুক্তিগুলোকে স্তিমিত করে দিতে পারে।

সিটিক্রাউপের এমঅ্যান্ডএ সহপ্রধান গুইলারমো বায়গুয়াল জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী না হলে ২০২৬ সাল ভালো যাবে। তবে তার মতে, প্রযুক্তি খাতের সম্ভাব্য ধীরগতির কারণে ২০২৬ সাল শেষ পর্যন্ত আগের বছরের রেকর্ড ভাঙতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বৈশ্বিক চুক্তিতে বড় কোম্পানিগুলো এগিয়ে থাকলেও প্রাইভেট ইকুইটি বা ব্যক্তিগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা স্থবিরতা দেখা গেছে। বছরের প্রথম তিন মাসে বেসরকারি বিনিয়োগ সমর্থিত চুক্তির সংখ্যা ১২ শতাংশ কমে ছয় বছরের সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। তবে সংখ্যার দিক থেকে কমলেও ডলারে এর পরিমাণ ৩১ হাজার ৪০০ কোটি।