জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, ভূবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) উচ্চপ্রতিনিধির কার্যালয়ের বিশেষজ্ঞ প্যানেল কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন মূল্যায়ন পরামর্শক সভায় গতকাল এ প্রতিবেদন উত্থাপন করেন জাতিসংঘের ডেভেলপমেন্ট পলিসি কমিটির পরামর্শক ড. ড্যানিয়েল গে ও রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং ইউএন-ওএইচআরএলএলএস যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরে এলডিসি উত্তরণ করলে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় এলডিসি উত্তরণের সুযোগ নেই।
সভায় র্যাপিড চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এ মূল্যায়নে আমরা ৮-১০টি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনা করেছি। বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। ২০২২ অর্থবছরে ছিল ৭ শতাংশ। অর্থাৎ এলডিসি উত্তরণের ঠিক আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি তার গতি হারিয়েছে। পাশাপাশি জটিল রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এটি নব্বইয়ের দশকের পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সংকট।’
তিনি বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি দারিদ্র্য হ্রাসের যে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি ছিল, তা এখন হুমকির মুখে। গত তিন বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যল্র বৃদ্ধির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। অনেক পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বেসরকারি খাত তার গতি হারিয়েছে। তৈরি পোশাক ছাড়াও ফার্মাসিউটিক্যালস, ফার্নিচার, প্লাস্টিক, সিমেন্ট, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প খাতে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান রয়েছে। কিন্তু উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সংকটের কারণে এ খাতগুলো চাপে রয়েছে।’
র্যাপিড চেয়ারম্যান বলেন, ‘মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি হ্রাস বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতার একটি স্পষ্ট চিত্র। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক খাতেও সংকট প্রকট। খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। সরকারি ঋণের চাপ বেড়েছে। গত আট মাসে রফতানি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের রফতানিতে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে, যেখানে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগীরা শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রথমত, নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করেছে—এটি সন্দেহাতীত। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় এলডিসি হওয়ায় আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী। ফলে উত্তরণের পর এ সহায়তা হারানোর ঝুঁকিও সবচেয়ে বেশি। তৃতীয়ত, মূল চ্যালেঞ্জ হলো এ উত্তরণ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালনা করা। এরই মধ্যে কিছু উন্নয়ন অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা উত্তরণ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ এলডিসি উত্তরণকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে কোনো দেশ উত্তরণের ফলে তার উন্নয়ন অর্জন হারিয়ে না ফেলে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। ফলে এ প্রক্রিয়া এখন একটি বড় পরীক্ষার মুখে।’
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ ও ২০২১ সালে জাতিসংঘের ধারাবাহিক মূল্যায়নে তিনটি শর্তই পূরণ করে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে উন্নীত হওয়ার কথা থাকলে অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরণে সময়সীমা পুনর্বিবেচনার আবেদন করে ও একটি কৌশলপত্র হাতে নেয়। তবে সে কৌশল বাস্তবায়ন না হওয়ায় ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়া বিএনপি সরকার সময়সীমা আরো তিন বছর পেছাতে জাতিসংঘের কাছে চিঠি পাঠায়। এ বিষয়ে বিশ্ব সংস্থাটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) কয়েকটি সভা করলেও এখনো চিঠির উত্তর দেয়নি।’
তবে এলডিসি উত্তরণের ঝুঁকির বিষয়গুলো উঠে এসেছে গতকালের মূল্যায়ন পরামর্শক সভায়। প্রতিবেদনটি উপস্থাপনকালে ড্যানিয়েল গে বলেন, ‘গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করেছে। বর্তমানে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিও নতুন চাপ তৈরি করছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ একা নয়, অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশই একই ধরনের অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা থেকে সরে এসে, বিশেষত ইইউতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর মতো বড় পরিবর্তন—এগুলোকে একটি জটিল ও সতর্কভাবে পরিচালিত রূপান্তর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি সহায়তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—যাতে উন্নয়নের অর্জনগুলো সংরক্ষিত থাকে। বিষয়টি এই নয় যে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। বরং কীভাবে উত্তরণের পর অর্জনগুলো আরো সুসংহত করা যায়, সেটি ভাবা দরকার।’
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি, তা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আমরা এমন একটি অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছি, যেখানে প্রায় সব সূচকের প্রবণতাই নিম্নমুখী। অর্থনীতি খুবই নিম্ন সমতাবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থা থেকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণ কোনো সমাধান নয়। আমরা এখন মূলত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার লড়াই করছি। উত্তরণের কথা পরে, এখন প্রধান লক্ষ্য অর্থনীতিকে বাঁচানো।’
পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এখন এলডিসি উত্তরণের সুযোগ নেই জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আমরা একটি ইকোনমিকে স্যালভেজ করার যুদ্ধের মধ্যে আছি। সরকার এ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এ মুহূর্তে গ্র্যাজুয়েশনের প্রশ্নই আসে না, কারণ অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নগামী। আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছি, তখনই পরিস্থিতি ছিল জটিল। তাই এখন গ্র্যাজুয়েশনের দিকে যাওয়ার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে যে বহুমুখী চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব অনেক বড়। এতে সরকারি তহবিলে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন ফায়ার ফাইটিং করছি।’
জ্বালানি সংকটের ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়বে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলবে।’
তবে এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্দেশে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা বলেন, ‘হঠাৎ করে বাণিজ্য সুবিধা প্রত্যাহার না করে পূর্বানুমানযোগ্য সহায়তা অব্যাহত রাখা, সহজ শর্তে অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং সক্ষমতা উন্নয়ন ও বাণিজ্য সহজীকরণে সহায়তা জোরদার করতে হবে।’
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘দেশ এখন একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করছে ও চলমান সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছে।’
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।










