বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হেডলাইন মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছায় নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি কমে গেছে, যা তাদের জীবনযাত্রার মানকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে যুব বেকারত্ব, যার বর্তমান হার প্রায় ৪০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। রাজধানীর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (পিআরআই) গতকাল ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: স্পেশাল ফোকাস—আ বিজনেস এনভায়রনমেন্ট দ্যাট ডেলিভার্স জবস’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। পিআরআই ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তারের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. ধ্রুব শর্মা।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থবির প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আরো ঘনীভূত হয়েছে। উপসাগরীয় এলাকার ভূরাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের গতি মারাত্মকভাবে হোঁচট খাবে। এ সংকটের সরাসরি প্রভাবে ২০২৬ সালে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অন্তত ১২ লাখ কম মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ধাক্কা যদি না থাকত, তাহলে চলতি বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপর উঠে আসতে পারত।
প্রতিবেদন থেকে আরো জানা গেছে, উচ্চ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর ধীরগতির কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা ধীর হয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও ৪ দশমিক ৬ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে ক্রমবর্ধমান বাহ্যিক অনিশ্চয়তার সময়ে বাংলাদেশের নীতিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, স্মার্ট ডিরেগুলেশন (নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ), সবার জন্য সমান সুযোগ, বেসরকারি খাতের বেশি অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি সাধন করলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে পিআরআই চেয়ারম্যান বলেন, ‘বর্তমানে কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যুব বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাস পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।’
তিনি আরো বলেন, ‘১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৬০ থেকে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসার পেছনে রফতানিমুখী প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য উদারীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ মডেল এখন নবায়ন ও শক্তিশালী করা উচিত।’
অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশকে স্বল্পমূল্যের শ্রম ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা নীতিনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেল থেকে সরে এসে বহুমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হতে হবে, যেখানে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বর্তমানে অধিকাংশ কর্মই অনানুষ্ঠানিক, স্বল্প মজুরিভিত্তিক ও অনিশ্চিত। উদীয়মান শিল্প খাতের জন্য সরকারি সুবিধা প্রয়োজন হলেও এর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত।’ তিনি ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বেসরকারি উৎপাদন খাতের সাশ্রয়ী অর্থায়নের প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) নির্বাহী পরিচালক টিআইএম নুরুল কবির, পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলম ও মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।










