বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশ ভারতে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশটি কয়লার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু সম্প্রতি ভারতে কয়লার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। জ্বালানি পণ্যটির মজুদ তলানিতে ঠেকেছে। ভয়াবহ ধস নেমেছে আমদানিতে। ফলে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। সহসাই সংকট না কাটলে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে দেশটির অর্থনীতি। এদিকে এমন সংকট প্রভাব ফেলছে বিশ্ববাজারেও।
ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) জানায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতের ১৩৫টি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৬টিতেই কয়লার মজুদ ছিল শূন্যের কোটায়। অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার যে পরিমাণ মজুদ ছিল তা দিয়ে সর্বোচ্চ তিনদিন উৎপাদন সম্ভব। এছাড়া ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে মাত্র এক সপ্তাহের মজুদ ছিল।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, ভারতে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৭০ শতাংশই আসে কয়লা থেকে। এছাড়া ভারতের মোট কয়লা ব্যবহারের ৭৫ শতাংশই যায় ইউটিলিটিতে (বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান)। কিন্তু কয়লার ভয়াবহ সংকট এসব খাতকে পঙ্গু করে তুলছে।
করোনা মহামারী দ্বিতীয় আঘাত হানার পর ভারতের শিল্প খাতে বিদ্যুতের চাহিদা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। এ কারণে কয়লার চাহিদা হু হু করে বাড়তে থাকে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে বাড়েনি সরবরাহ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয় বাজারে কয়লার দাম কম। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। দামের এমন তারতম্যের কারণে ক্রেতারা কয়লা আমদানিতে আগ্রহ হারিয়েছেন।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লা উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান কোল ইন্ডিয়া। মোট কয়লার ৮০ শতাংশই উত্তোলন করে প্রতিষ্ঠানটি। কোল ইন্ডিয়া জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম এবং জাহাজীকরণ ব্যয় বৃদ্ধি ভারতের বিদ্যুৎ খাতের জন্য ভয়াবহ হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়লাচালিত কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্রমাগত কমছে। কয়লা উত্তোলন খনিগুলোও চাপের মুখে রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা জানান, কয়লার তীব্র সংকটের জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দামের তারতম্যকে দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে কয়লার দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে কোল ইন্ডিয়ার ওপর। পণ্যটির দাম বাড়ালে বিদ্যুতের দাম ও মূল্যস্ফীতিতে বড় প্রভাব পড়ে। এছাড়া মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল। ফলে মূল্যবৃদ্ধি এবং হ্রাসের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। গত বছর বিশ্ববাজারে কয়লার দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠলেও দেশীয় বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখে কোল ইন্ডিয়া। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জানান, খনির মালিকরাই দাম বাড়াবেন। কিন্তু ঠিক কবে নাগাদ দাম বাড়ানো হবে তা তিনি জানাননি। স্থানীয় বাজারে দাম না থাকায় কয়লা উত্তোলনে লোকসানে পড়ছেন খনি মালিকরা, বাড়ছে অনীহা। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দাম বাড়তে থাকায় লোকসানের আশঙ্কায় কয়লা কিনছেন না আমদানিকারকরা।
সম্প্রতি এশিয়ার বাজারে কয়লার রেকর্ড দাম বেড়েছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী হচ্ছে কয়লার চাহিদা। সর্বশেষ চীনে বিদ্যুৎ সংকট পণ্যটির চাহিদাকে আরো জোরদার করে তুলেছে।
এদিকে ভারতে কয়লা সংকটের এমন ভয়াবহ চিত্র বিশ্ববাজারে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ কয়লা আমদানিকারক, উৎপাদক ও ব্যবহারকারী। দেশটিতে বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ কয়লার মজুদ রয়েছে। প্রধানত ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা আমদানি করে ভারত।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, সরবরাহ সংকট এবং চীন ও অন্যান্য দেশের ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ধাতব কয়লার বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। চলতি অর্থবছর পণ্যটির দাম লাগাম ছাড়া হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতে সৃষ্ট সংকট বিশ্ববাজারে কয়লার মূল্যবৃদ্ধি অভাবনীয় রূপ ধারণ করতে পারে।
পণ্যবাজার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপলারের দেয়া তথ্যমতে, আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত ভারতের সাপ্তাহিক কয়লা আমদানি ৩০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। সর্বশেষ সপ্তাহে দেশটি সব মিলিয়ে ১৫ লাখ টন কয়লা আমদানি করে, যা দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন আমদানি। সূত্র: রয়টার্স










