কয়েক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব বাণিজ্যে উন্মুক্ত অর্থনীতির দেশ হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে আসছে সিঙ্গাপুর। আয়তনে ছোট হলেও অর্থনৈতিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ দেশটি। প্রাকৃতিক সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হওয়ায় বিদেশী অভিবাসন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। কিন্তু এ সুবিধা দেশটির প্রবৃদ্ধিতে বাধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। খবর আল জাজিরা।
চলতি সপ্তাহে সিঙ্গাপুর প্রথমবারের মতো ফরেন ইন্টারফেয়ারেন্স (বিদেশী হস্তক্ষেপ) আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য ৫৯ বছর বয়সী চ্যান ম্যান পিং ফিলিপকে বিশেষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে এ বিষয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন চলছিল।
সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, হংকংয়ে জন্ম নেয়া চ্যান বিদেশীদের মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছেন। পাশাপাশি তাদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এখন থেকে চ্যানকে ১০ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার (প্রায় ৪ হাজার ৭০০ ডলার) বা এর বেশি কোনো রাজনৈতিক অনুদান পেলে অথবা বিদেশী সংযোগ থাকলে কিংবা কোথাও কোনো অভিবাসন সুবিধা পেলে তা সিঙ্গাপুরি কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
চ্যান সিঙ্গাপুরে কোন দেশের স্বার্থ রক্ষা করছেন, তা দেশটির সরকার এখনো প্রকাশ করেনি। তবে এ ব্যবসায়ী ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার চীনের পক্ষ নিয়ে নানা সুপারিশ ও বক্তব্য রাখার জন্য এরই মধ্যে বেশ পরিচিতি পেয়েছেন। এর আগে গত বছর চীনের এক পার্লামেন্টারি বৈঠকে অংশ নেয়ার পর চীনা সংবাদ মাধ্যমকে চ্যান বলেছিলেন, ‘বিদেশে অবস্থানরত নাগরিক হিসেবে চীনের ভালো গল্পগুলো এবং অসাধারণ কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের কথা প্রচার করা আমাদের কর্তব্য।’
চায়না লিংক এডুকেশন কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠা করেন চ্যান। এছাড়া হংকং সিঙ্গাপুর বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন ও কাউলুন ক্লাবের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০১৯ সালে তাকে সিঙ্গাপুরে পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছিল। মূলত সিঙ্গাপুরের আইন লঙ্ঘন করে হংকংয়ের একটি বিতর্কিত বিলের ওপর আলোচনা করতে জনসমাগম আয়োজনের জন্য তাকে সতর্ক করা হয়।
২০২১ সালে সিঙ্গাপুরে বিদেশী হস্তক্ষেপ (প্রতিরোধ) আইন বা এফআইসিএ পাস হয়। তবে বিরোধী রাজনীতিবিদ ও অধিকার কর্মীরা এর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তাদের মতে, ভিন্নমত দমনে আইনটি ব্যবহার করা হতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশ একই ধরনের আইন পাস করেছে। কিন্তু সিঙ্গাপুরের জন্য উন্মুক্ত অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা ভারসাম্য রক্ষার কাজটি বেশ জটিল।
নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির চীনা বৈদেশিক নীতির বিশেষজ্ঞ ডিলান লোহ আল বলেন,”‘সিঙ্গাপুরের জন্য, বিদেশী প্রভাব নিয়ে সবসময়ই একটি উদ্বেগ রয়েছে। এটি যে শুধু চীনের জন্য নির্দিষ্ট তা নয়। কেননা আমরা একটি উন্মুক্ত অর্থনীতির দেশ এবং একই সঙ্গে প্রায় শতভাগ ডিজিটালাইজেশন নির্ভর।’
সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটি অব সোশ্যাল সায়েন্সের আইনের প্রভাষক বেন চেস্টার চেওং বলেন, ‘সিঙ্গাপুর বর্তমানে চ্যালেঞ্জিং অবস্থানে রয়েছে। কেননা এখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের সমতা নীতির ভিত্তিতে অংশীদারদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়ে আহ্বান জানানো হয়।
আল-জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে চেওং জানান, চারপাশে যা ঘটছে সিঙ্গাপুরের বৈদেশিক নীতির মৌলিক বিষয় বিবেচনা করেই সেগুলো বুঝতে হবে। একটি ছোট ও উন্মুক্ত অর্থনীতি হিসেবে, এটি অনিবার্য যে সিঙ্গাপুরকে প্রযুক্তি, সমাজ ও একাডেমিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির নানয়াং বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক আলতাফ মারসুফ বলেন, ‘আইনটি আসলে ব্যবসায়িক আস্থা বাড়াতে পারে। কারণ স্থিতিশীল ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশের মৌলিক পূর্বশর্ত হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা।’










