চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে তামার দাম বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল। বর্তমানে কিছুটা উত্থান-পতন থাকলেও ধাতুটির বাজারদর এখনো অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। দেশে দেশে তামার ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে নেই পর্যাপ্ত সরবরাহ। অস্থিতিশীল বাজার। এমন পরিস্থিতিতে তামাসমৃদ্ধ দেশগুলো ধাতুটির উত্তোলন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে পেরু।

ইন্টারন্যাশনাল কপার স্টাডি গ্রুপ (আইসিএসজি) সম্প্রতি তামার বৈশ্বিক চাহিদা, উৎপাদন, সরবরাহ ও দাম নিয়ে মাসভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ব্যবহারিক ধাতুটির বৈশ্বিক উত্তোলন ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। কনসেনট্রেট (তামা উৎপাদনের কাঁচামাল) উত্তোলন বেড়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে সলভেন্ট এক্সট্র্যাকশন-ইলেকট্রোওয়াইনিং ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে গেছে।

প্রতিবেদনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী শুরুর পর তামা উত্তোলন খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে গত বছরের জুনে তামা শিল্প খাতে লকডাউন ও বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। গ্রহণ করা হয় স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিষয়ক নীতিমালা। ফলে ধাতুটির বৈশ্বিক উত্তোলন পুনরুদ্ধার হতে শুরু করে। যদিও চলতি বছর করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রাদুর্ভাবে কিছু দেশে উত্তোলন বাধার মুখে পড়ে।

তবে বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বৈশ্বিক উত্তোলন প্রবৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ তামা উত্তোলনকারী দেশ পেরু। চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশটির উত্তোলন ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। মূলত মার্চ-মে পর্যন্ত সময়ে উত্তোলনে উল্লম্ফন প্রথমার্ধের উত্তোলন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এ সময় পেরুর তামা উত্তোলন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

ইন্দোনেশিয়ার গ্রাসবার্গ খনিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তামার প্রাকৃতিক মজুদ রয়েছে। চলতি বছর এ খনির ভূগর্ভস্থ উত্তোলন কর্মকাণ্ড লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। এটি ইন্দোনেশিয়ার মোট তামা উত্তোলনে জ্বালানি জুগিয়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশটির উত্তোলন ৬৯ শতাংশ বেড়েছে বলে জানায় আইসিএসজি।

তবে বৈশ্বিক উত্তোলন বাড়লেও পিছিয়ে পড়েছে বিশ্বের শীর্ষ তামা উত্তোলক দেশ চিলি। দেশটির তামা উত্তোলন খনিগুলোতে একের পর এক শ্রমিক আন্দোলন তামা উত্তোলন খাতকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ বছরের প্রথমার্ধে দেশটির উত্তোলন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যুগে প্রবেশ করছে আধুনিক বিশ্ব। অপরিশোধিত জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা কয়লা; এসব দূষিত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সৌর, জল ও বায়ুবিদ্যুৎ। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পেট্রল কিংবা ডিজেলচালিত যানবাহনের জায়গা দখল করে নেবে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি। পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য এসব জ্বালানি উৎপাদনে বিশ্ববাজারে বাড়ছে তামার চাহিদা। নতুন মাত্রা পাচ্ছে ধাতুটির ব্যবহার। বছরের প্রথমার্ধে পরিশোধিত তামার ব্যবহার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে বলে জানায় আইসিএসজি।

এদিকে পরিশোধিত তামার বৈশ্বিক উৎপাদনও বেড়েছে। আইসিএসজির প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বজুড়ে পরিশোধিত তামা উৎপাদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আফ্রিকার দেশগুলো। এ অঞ্চলে পরিশোধিত তামা উৎপাদন বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।