সম্প্রতি খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম বেড়ে কয়েক বছরের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। ফলে তৈরি হচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকি। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খাদ্যপণ্যের এমন মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ভোজ্যতেল। খরা, শ্রমিক সংকট ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ দেশে দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদন খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ফলে মহামারীর সংকট কাটিয়ে চাহিদায় উল্লম্ফন অনুপাতে সরবরাহ বাড়ছে না।

বিভিন্ন মহাদেশের প্রধান প্রধান উৎপাদক দেশ বহুমুখী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। এর মধ্যে পাম অয়েল উৎপাদনে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া, সরিষা উৎপাদনে কানাডা, সূর্যমুখী উৎপাদনে ইউক্রেন এবং সয়াবিন উৎপাদনে ব্রাজিল ও আমেরিকার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মধ্যে রয়েছেন। পর্যাপ্ত চাহিদা থাকলেও উৎপাদন ঘাটতির কারণে জোগান দিতে পারছে না এসব দেশ। ফলে হু হু করে বাড়ছে ভোজ্যতেলের দাম। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্যের বাজারে।

প্রতি মাসেই খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক প্রকাশ করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। চলতি বছর এ সূচক ১০ বছরের সর্বোচ্চে উঠেছে। এর পেছনে ভোজ্যতেলের আকাশছোঁয়া দামকেই দায়ী করছে সংস্থাটি। এফএওতে ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক মূল্যসূচক গত জুনের পর ৯১ শতাংশ বেড়েছে। মহামারীজনিত বাধা কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যত বেশি গতিশীল হবে, ভোজ্যতেলের দাম তত বেশি বাড়বে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক উৎপাদন খাতে সবচেয়ে বড় অন্তরায় শ্রমিক সংকট। কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গৃহীত নানা বিধিনিষেধ শ্রমিক সংকটের প্রধান কারণ। এছাড়া বৈরী আবহাওয়াও উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। রয়েছে ইঁদুরসহ কীটপতঙ্গের প্রাদুর্ভাবও। এসব প্রতিবন্ধকতা বহুল ব্যবহূত ভোজ্যতেল পাম অয়েল, সয়াবিন, সরিষা ও সূর্যমুখী তেলের বৈশ্বিক মজুদ এক দশকের সর্বনিম্নে নামিয়ে এনেছে।

পাম অয়েলের বৈশ্বিক রফতানির ৩৩ শতাংশই আসে মালয়েশিয়া থেকে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশটির পাম ফল উৎপাদন কমে হেক্টরপ্রতি ৭১ লাখ ৫০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময় উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৭৮ লাখ ৫০ হাজার টন। মালয়েশিয়ান পাম অয়েল বোর্ডের দেয়া তথ্যানুযায়ী, প্রথমার্ধে প্রতি হেক্টর জমি থেকে অপরিশোধিত পাম অয়েল (সিপিও) উৎপাদিত হয়েছে ১৪ লাখ ১০ হাজার টন। অথচ গত বছরের একই সময়ে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন।

মালয়েশিয়ান সরকার করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে শ্রমশক্তি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে বেশির ভাগ পাম অয়েল বাগানে শ্রমিকসংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে যায়। শ্রমিক সংকটের কারণে বাগানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়েছে। ফলে বাড়ছে ইঁদুরসহ নানাধরনের কীটপতঙ্গের উৎপাত।

ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষ পাম অয়েল উৎপাদক। দেশটিতে মালয়েশিয়ার মতো শ্রমিক সংকট নেই। এ বছর আবাদ বেড়েছে। ভালো হয়েছে ফলনও। ফলে পামফল উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে লকডাউনসহ নানা বিধিনিষেধের কারণে ফল থেকে অপরিশোধিত পাম অয়েল উৎপাদন কারখানাগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পাম অয়েলের বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। চলতি বছর দেশ দুটি ৬ কোটি ৬২ লাখ টন পাম অয়েল উৎপাদন করবে বলে জানায় পণ্যবাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেফিনিটিভ। সে হিসাবে উৎপাদন গত বছরের মতো অপরিবর্তিত থাকবে। তবে শ্রমিক সংকট ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ বাড়লে উৎপাদন কমে আসতে পারে।

এদিকে ক্যানোলা (এক ধরনের তেলবীজ) উৎপাদনে শীর্ষ দেশ কানাডায় খরার প্রভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শুষ্ক মাটিতেই শস্যটির আবাদ করেছেন দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা। উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কায় এ বছরের মে মাসে দেশটির ক্যানোলার ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য বেড়ে সর্বকালের শীর্ষে উঠে আসে। জুলাইয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে উৎপাদন। এ সময় তীব্র দাবদাহ দেখা দিলে আবাদকৃত সরিষা গাছ ঝলসে যায়। চলতি মৌসুমে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) কানাডার ক্যানোলা উৎপাদন হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছে। দেশটির উৎপাদন ৪২ লাখ টন কমে ১ কোটি ৬০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। এটি ২০১২-১৩ মৌসুমের পর সর্বনিম্ন উৎপাদন।

অন্যদিকে খরার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন উৎপাদন খাতেও ধস নেমেছে। ইউএসডিএ আগস্টে দেশটির সয়াবিন উৎপাদনের পূর্বাভাস এর আগের মাসের তুলনায় ১৮ লাখ টন কমিয়ে আনে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন তেলের মজুদ কমে আট বছরের সর্বনিম্নে নেমে যেতে পারে। পণ্যটির রফতানি এক দশকের সর্বনিম্নে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

তবে ক্রেতাদের জন্য ভালো খবর হলো, বিশ্বের শীর্ষ সয়াবিন উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিলে উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও দেশটির কৃষকরা দাম বৃদ্ধির প্রত্যাশায় শস্যটি বিক্রি না করে মজুদ করে রাখছেন। এটি সরবরাহ ধারায় বাধার সৃষ্টি করতে পারে। চলতি মৌসুমে ব্রাজিলের সয়াবিন উৎপাদন ১৪ কোটি ৪০ লাখ ৬০ হাজার টনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

ইউএসডিএ বলছে, ইউক্রেনে গত বছরের খরার প্রভাব কাটছে। ফলে সূর্যমুখী উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চলতি বছর দেশটির উৎপাদন ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।

তবে সব মিলিয়ে ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক উৎপাদনের দুর্বল চিত্র ঘাটতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্রমেই এসব পণ্যের মজুদ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে আগামী বছর ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক বাজার আরো বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।             সূত্র: রয়টার্স