রুপিকে আন্তর্জাতিকীকরণে ভারতের নতুন যাত্রা শুরুতেই প্রত্যাশিত গতি হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক রফতানি বাণিজ্যে দেশটির উপস্থিতির স্বল্পতা ও অন্যতম অংশীদার দেশ রাশিয়ার অনাগ্রহ বড় ভূমিকা পালন করেছে। রয়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে রুপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউয়ানের বিস্তার। খবর দ্য বিজনেস টাইমস। 

১৮টি দেশের এক ডজনের বেশি ব্যাংককে রুপিতে লেনদেনের অনুমোদন দিয়েছে দ্য রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোকে উৎসাহিত করেছে বাণিজ্যে রুপি ব্যবহারে। কিন্তু সাফল্য এখন পর্যন্ত অধরা। প্রকল্প শুরু হওয়ার পর স্থানীয় মুদ্রা বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি রুপি বা ১২ কোটি ডলার। বিপরীতে গত অর্থবছরে ভারতের মোট বাণিজ্য ছিল ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রুপিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেয়ার জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে কভিড-১৯-পরবর্তী পৃথিবীতে চীনের বিকল্প অবস্থান তৈরি করতে চায়। অথচ ভারত যখন রুপিকে আন্তর্জাতিক করার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে, তখন গৃহীত কিছু পদক্ষেপই পরিকল্পনার বিপরীতে এসে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ার তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশটি বৈশ্বিক রফতানি বাণিজ্যে হিস্যা মাত্র ২ শতাংশ। রয়েছে অন্যান্য সীমাবদ্ধতাও।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ‘‌দ্য ডলার ট্র্যাপ’ গ্রন্থের লেখক ঈশ্বর প্রসাদ দাবি করেছেন, রুপির আন্তর্জাতিক মুদ্রা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ভারতের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি জড়িত পুঁজির উন্মুক্ততা ও অর্থনৈতিক বাজারের মান। 

তবে সম্প্রতি প্রতিবন্ধকতাগুলো আরো স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ভারতের কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানির সময় ভারত রুপি ব্যবহারের তোড়জোড় চালিয়েছে। বিশ্লেষণী সংস্থা কেপলারের দেয়া তথ্যানুসারে, ভারতের জ্বালানি তেল আমদানির অর্ধেকই আসে রাশিয়া থেকে, যেখানে ইউক্রেন আক্রমণের আগে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আসত মাত্র ২ শতাংশ। লেনদেনে রুপি ব্যবহারের ঝুঁকি বিবেচনায় রাশিয়া প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। বরং ইউয়ান কিংবা আরব আমিরাতি দিরহামকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। দ্বিদেশীয় বাণিজ্যে প্রতি মাসে ১০০ কোটি ডলার রুপিতে হওয়ার কথা ছিল, যা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

উদ্বৃত্ত রুপি মোকাবেলা করার জন্য ভারত অন্য দেশগুলোকে সরকারি বন্ড ও বিলগুলোয় বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে। নয়াদিল্লি তার বাজার নিয়েও বেশ সতর্ক। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বন্ড প্লাটফর্মে কর ছাড় দিতে অস্বীকার করেছে ভারত, যা বৈশ্বিক ঋণসূচকে ভারতের অন্তর্ভুক্তিকে সহজ করে তুলত। তাছাড়া বিদেশী বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর শান্তিকান্ত দাস বলেছেন, আন্তর্জাতিকীকরণ একটি প্রক্রিয়া। আমরা একে ইভেন্ট বা লক্ষ্য আকারে দেখি না, যেখানে নির্দিষ্ট কোনো তারিখের আগে আমাদের পৌঁছতেই হবে।

রুপির আন্তর্জাতিকীকরণের প্রচেষ্টার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে ইউয়ানের নাম। কারণ চীন বেশ জোরেশোরেই ইউয়ানকে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রচেষ্টায় লিপ্ত। ব্রাজিল ও চীন সম্প্রতি স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করার ব্যাপারে চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। উত্তরণ ঘটাতে চাচ্ছে গ্রিনব্যাকের প্রভাব থেকে। এমনকি ফ্রান্সও ইউয়ানে লেনদেন করার প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি ইউয়ান ব্যবহারে সম্মত। সুইফট প্রকাশিত জরিপ অনুসারে, চীনের ইউয়ান মে মাসে বৈশ্বিক লেনদেনের মুদ্রা হিসেবে পঞ্চম অবস্থানে ছিল, যেখানে রুপির অবস্থান শীর্ষ বিশের মধ্যেও নেই। বৈদেশিক মুদ্রার টার্নওভারের পরিপ্রেক্ষিতে ইউয়ানের হিস্যা ৭ শতাংশ, যেখানে রুপি রয়েছে মাত্রা ১ দশমিক ৬ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ভাষ্যানুসারে, ভারত ২০২৮ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ ভূমিকা পালনকারী হয়ে উঠতে পারে। সে দিক বিবেচনায় এখনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সুবিধাগুলো পরিমাপ করা কঠিন নয়। রুপির ব্যবহার ভারতীয় ব্যবসার জন্য মুদ্রার ঝুঁকি হ্রাস করবে ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রাখার প্রয়োজনীয়তা কমাবে। বাহ্যিক আঘাতের জন্য তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে অর্থনীতিকে। সেদিকে ইঙ্গিত করে ব্লুমবার্গকে দেয়া সাক্ষাৎকারে রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ঊষা থোরাত দাবি করেছেন, ‘‌ভারত রুপিকে রিজার্ভ কারেন্সি বানাতে আগ্রহী নয়। ভারত শুধু রুপিকে লেনদেন ও পেমেন্টের সহজ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।’