বহুমুখী প্রতিবন্ধকতায় লম্বা সময় ধরে নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের সার্কুলার মেশিননির্ভর নিটিং শিল্প। প্রয়োজন অনুযায়ী মিলছে না বড় অংকের ব্যাংক ঋণ। বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যাপক চাপের মুখে ব্যবসায়ীরা। লোকসানের ভার সামাল দিতে না পেরে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক নিটিং কারখানা।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি নিটিং শিল্প। তার ওপর স্থানীয় ও বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান অস্থিরতা, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণ পরিশোধের চাপ ব্যবসায়ীদের আরো বৈরী পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, স্পিনিং মিলে উৎপাদিত সুতা থেকে নিট গার্মেন্টসের গ্রে কাপড় করে নিটিং কারখানাগুলো। আর এসব কারখানার বেশির ভাগেই ব্যবহার হয় সাকুলার নিটিং মেশিন। বর্তমানে দেশে অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত নিটিং কারখানার সংখ্যা সাড়ে ছয়শরও বেশি। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জেই আছে প্রায় ৩০০ কারখানা। দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে এ খাতের কারখানা রয়েছে প্রায় দুই হাজারটি। মোট নিটওয়্যার রফতানির ৫-৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের জোগান দেয় সার্কুলার নিটিং মেশিননির্ভর কারখানাগুলো।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সেলিম সারোয়ার বলেন, ‘বর্তমানে সার্কুলার মেশিননির্ভর নিটিং শিল্পের অবস্থা খুবই নাজুক। বিশেষ করে কভিড-১৯ মহামারী শুরুর পর এ শিল্প রুগ্ণ হয়ে পড়ে। এখন অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। লোকসানের বোঝা টানতে টানতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা খুব স্বল্প মজুরিতে সুতা থেকে কাপড় তৈরি করে নিট গার্মেন্টসে সরবরাহ করি। প্রতি কেজি সিঙ্গেল জার্সি কাপড় তৈরি করতে আমাদের মজুরি নির্ধারণ করা আছে মাত্র ১৫ টাকা, আর নিট ফেব্রিক্সস ২০ টাকা। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে বিদ্যুতের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি ও নিট কাপড় তৈরির কাঁচামালের দাম। তার ওপর ফ্লোর ভাড়া, আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্য পরিশোধে বিলম্ব। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাপড় সরবরাহ করলেও পেমেন্ট পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয় গার্মেন্টস মালিকের দ্বারে দ্বারে। ফলে সময়মতো শ্রমিকের বেতন-ভাতা দেয়াটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দুয়েক মাসের মধ্যে বিকেএমইএসহ নিট শিল্পসংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসব। সিঙ্গেল জার্সি ফ্যাব্রিক্সের নিটিং মজুরি বাড়িয়ে ১৫ টাকার পরিবর্তে ২০-২২ টাকা এবং নিটিং ফ্যাব্রিক্সের মজুরি ২৪-২৫ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হবে। মজুরি না বাড়ানো হলে এ শিল্প টিকিয়ে থাকা মুশকিল হবে।’
নিটিং ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ান, কোরিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুর থেকে আধুনিক সার্কুলার মেশিন দেশে নিয়ে আসেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী রেইনবো গ্রুপের আব্দুস সালাম, রহমান গ্রুপের বজলুর রহমান এবং সম্রাট গ্রুপের শাহজাহান মিয়া। তাদের হাত ধরেই এখানে আধুনিক নিটিং শিল্পের যাত্রা শুরু। পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জে অন্য গার্মেন্টস মালিকরা এ আধুনিক মেশিন এনে তাদের কারখানায় যুক্ত করেন। নব্বইয়ের দশকে এসে নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এ সার্কুলার মেশিননির্ভর নিটিং কারখানা।
বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি (অর্থ) মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমান বাজারে ১০টি আধুনিক মেশিন নিয়ে একটি কারখানা করতে হলে কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু আমরা যখন ব্যাংক থেকে সহায়তা চাই ব্যাংক আমাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হিসেবে এসএমই ঋণ দেয়, যা সর্বোচ্চ ১৫-২৫ লাখ টাকা। এই ঋণ পেতেও পোহাতে হয় অনেক ঝামেলা। পরিশোধের সময় নানা অজুহাতে ব্যাংক আমাদের কাছ থেকে ১৬-১৭ শতাংশ হারে সুদ নেয়।’
নিটিং শিল্পকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ক্যাটাগরি থেকে মাঝারি শিল্প ক্যাটাগরিতে আসার দাবি জানান কামাল হোসেন। এটি করা হলে বড় অংকের ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন এ ব্যবসায়ী নেতা।
নিটিং শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। এ শিল্পকে গতিশীল করতে সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘নিটিং মজুরি বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পেমেন্টপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, দক্ষ নিটিং মাস্টার ও কারিগর তৈরিসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়ে আমার কাজ করছি। আজকে নিটিং শিল্প নাজুক পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। কিন্তু আমরা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমরা নিটিং শিল্পের জন্য সরকারের কাছে নারায়ণগঞ্জে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দাবি করছি।’










