বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন দোদুল্যমান। একদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ সংকট। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় সুদহার বাড়াচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক। সুদহারের কারণে ব্যবসা খাতও অনিশ্চয়তায়। সম্প্রতি সুদহার বাড়ানো বন্ধ রাখে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন হয়তো সুদহার বাড়ানোর অধ্যায় শেষ হচ্ছে এবং সামনের মাস থেকে তা কমবে। কিন্তু সহসাই এতে কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে জানা গেছে।
লাইভমিন্টে প্রকাশিত খবরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর বড় ব্যাংকগুলোর সুদহার থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতি মুক্তি পাবে না। বিনিয়োগকারীদের উচ্চ সুদহার যুগ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা এখনো থেকে থাকলে তা হতে পারে বড় ধাক্কার কারণ।
সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে ব্যাংকগুলোর লড়াই অব্যাহত। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া এবং ব্যাংক অব কানাডাসহ অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকই জুনে সুদহার বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়ানো স্থগিত করলেও উভয় ব্যাংকই স্পষ্টভাবে বলেছে, মূল্যস্ফীতি এখনো তাদের লক্ষ্য মাত্রার ওপরে। এ স্থগিতাবস্থা সুদহার বৃদ্ধির বিরতিমাত্র। সুদহার কমার ব্যাপারে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।
মার্কিন অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে স্বস্তিতে রাখার জন্য মূল্যস্ফীতিকে ২ শতাংশে ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ এবং এ বছর সুদহার আরো বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়েল। ভারতীয় অর্থনীতির দৃঢ় প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা বাজারকে টিকিয়ে রাখবে বলে বিশ্লেষকরা আশাবাদী। তবে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত বলেও জানিয়েছেন তারা। কয়েক দফায় সুদহার বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে অস্থির করে রাখছে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইঙ্গিত থেকে মেহতা ইকুইটিজের পরিচালক শরদ চন্দ্র শুক্লা পর্যবেক্ষণ করেছেন, এ বছর আরো দুটি ত্রৈমাসিক পয়েন্ট হার বৃদ্ধির প্রয়োজন হতে পারে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের প্রত্যাশিত পর্যায়ের কাছাকাছি থাকলেও এখনও লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি বলে জানানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ প্রত্যাশার চেয়েও বেশি স্থায়ী হয়।
সামনের বছরে সুদহার প্রশমনের ব্যাপারে মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নেমে আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতি চাকরি ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি করে। বর্তমানে মার্কিন অর্থনীতিতে শক্তিশালী শ্রমবাজার রয়েছে। কিন্তু চাকরি হারানোর সম্ভাবনার কারণে কর্মীদের মনোভাব নেতিবাচক হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর বিশ্ব বাজারের প্রভাব থাকে। ভারতীয় বাজারের একমাত্র সুবিধা ভারতীয় অর্থনীতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। তাই এটি বাইরের বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করবে। বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আর্থিক কড়াকড়ির সূচনা করেছে। এ পদক্ষেপ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে তাদের হাতে থাকা সমাধানের অংশ। ফলে বড়সংখ্যক দেশে মন্দার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। এইচডিএফসি সিকিউরিটিজের রিটেইল রিসার্চ বিভাগের প্রধান দীপক জাসানি এমনটাই ভাবছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করা অন্যতম দেশ যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়েছে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে বছরভিত্তিক তুলনায় যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। স্যামকো সিকিউরিটিজের মার্কেট পারসপেক্টিভ অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের প্রধান অপূর্ব শেঠ বলেন, ‘আমরা মনে করি ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাজ্যে কী ঘটছে তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের এ প্রতিষ্ঠান দুটির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখা উচিত।’
যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সুদহার বাড়ানো বন্ধ করলেও সতর্ক করতে ছাড়েনি। মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সুদহার বাড়াবে না বলে মনে করেন শেঠ। কিন্তু যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার আগ পর্যন্ত সুদহার বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।










