বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বিশ্বের প্রধান হিসাব নিরীক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো বেছে নিচ্ছে ভারতের ছোট শহরগুলোকে। ব্যয়বহুল বড় শহরের তুলনায় এগুলো সাশ্রয়ী হওয়ায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে তারা। ফলে কর্মচাঞ্চল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও এগিয়ে যাচ্ছে এ শহরগুলো। খবর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। 

কয়েক দশক ধরে ভারতের বড় শহর যেমন মুম্বাই, দিল্লি কিংবা বেঙ্গালুরুকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বৈশ্বিক বহুজাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অন্যান্য দেশের তুলনায় সহজে ও স্বল্প পারিশ্রমিকে আইটিতে দক্ষ ও মেধাবী অনেক কর্মী তারা পেয়েছে এবং বৃহৎ পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। 

বর্তমানে ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে ব্যবসায়িক পরিষেবা রফতানি। তবে বিশ্বব্যাপী সফটওয়্যারের মন্দা চাহিদা এবং বড় শহরের কেন্দ্রে কার্যক্রম পরিচালনার ক্রমবর্ধমান খরচ, উচ্চ প্রতিযোগিতা এবং কভিড মহামারীর পর কর্মীদের অফিসে ফিরিয়ে আনার ধীর অগ্রগতির মতো চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাতটি। 

জুনে ব্রিটিশ বহুজাতিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয় তারা, জয়পুর, কোচি ও চণ্ডীগড়ের মতো শহরে সব ধরনের শিল্পের জন্য ‘গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার’ স্থাপন করবে বলে চিন্তা করছে। এ ধরনের পরিষেবা কেন্দ্রের সংখ্যা ১ হাজার ৬০০ থেকে বেড়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ২ হাজার ৪০০-তে পৌঁছতে পারে, যা ২ কোটি ৬০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি ডলার যোগ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর অর্থ, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত ব্যবসা কেন্দ্রগুলো থেকে দূরে উচ্চ বেতনের অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। 

উত্তর ভারতের শহর পাতিয়ালা থেকে গণিতে স্নাতক করেছেন ২৭ বছরের দীক্ষা মেহতা। তিনি বৈশ্বিক আর্থিক পরামর্শক সংস্থা ডেলয়েটের সাইবার নিরাপত্তা দলে যোগদানকারী হাজার হাজার ভারতীয় কর্মীদের একজন। তার কাজ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাংক ও ইউরোপের খুচরা ক্লায়েন্টদের বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করা।

মহামারীর পর উন্নত দেশগুলোয় কর্মসংস্থান হ্রাস, অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতকদের সংখ্যা হ্রাস, বাড়তি মজুরি প্রদান এবং ভিসা বিধিনিষেধের মধ্যে ভারতকে কর ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহক ব্যবস্থাপনার মতো বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পরিষেবাগুলোর জন্য একটি পাওয়ারহাউজ হিসেবে আবির্ভূত হতে সাহায্য করেছে। 

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পরিষেবা রফতানিকারকদের মধ্যে রয়েছে ভারত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হিসাব অনুসারে, বিশ্বব্যাপী পরিষেবা বাণিজ্যে দেশটি এর অংশগ্রহণ দ্বিগুণ করেছে। ২০০৫ সালের ২ শতাংশ থেকে যা বেড়ে বর্তমানে ৪ শতাংশের ওপরে রয়েছে। ডেলয়েটের দক্ষিণ এশিয়ার চিফ গ্রোথ অফিসার দেবাশীষ মিশ্র বলেন, ‘ইংরেজিতে দক্ষ হিসাব ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানে স্নাতক ব্যাপক সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বৈশ্বিক জায়ান্টরা মনে করছেন ভারতের ছোট শহরগুলোয় কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ এবং আরো বেশি প্রতিযোগিতামূলক।’ 

ভারতে লক্ষাধিক কর্মী নিয়োগ দিয়েছে ডেলয়েট। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আগামী তিন বছরের মধ্যে আরো ৫০ হাজার কর্মী নিয়োগ এবং নতুন শহরগুলোয় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। বহুজাতিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, আগামী তিন বছরে ২০ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে তারা। মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে বহুজাতিক কর, নিরীক্ষা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কর্মীকে নিয়োগ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভারতে পিডব্লিউসির চিফ পিপল অফিসার পদ্মজা আলাগানন্দন বলেন, চলতি বছরও একই সংখ্যক কর্মী নিয়োগের আশা করছে তারা। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চলতি অর্থবছর ঘিরে পরিষেবা রফতানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। দেশটির সার্ভিসেস এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের সভাপতি সুনীল তালাটি বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরে মোট পরিষেবা রফতানি ভারতের মোট পণ্য রফতানিকে ছাড়িয়ে ৭৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে।