এশিয়ার দেশগুলোয় রাশিয়া থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি লক্ষণীয় মাত্রায় কমছে। পর্যাপ্ত সরবররাহ থাকায় এ অঞ্চলের ক্রেতারা আমদানিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন। ফলে আমদানি কমে দুই বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে। খবর অয়েলপ্রাইস ডটকম। 

এলএনজি পরিবাহী জাহাজের তথ্য পরিষেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, জুন মাসে এশিয়ার দেশগুলোয় রাশিয়া থেকে এলএনজি আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। ২০২১ সালের আগস্টের পর যা সর্বনিম্ন। 

চীন এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এলএনজি আমদানিকারক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটি রুশ জ্বালানি তেল আমদানির পরিমাণ নজিরবিহীন বাড়িয়েছে। মূলত কম দামের কারণে দেশটি থেকে তুলনামূলক বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করছেন চীনের ক্রেতারা। অন্যদিকে রাশিয়াও পশ্চিমা বাজারগুলোর বিকল্প হিসেবে ভারত ও চীনসহ এশিয়ার দেশগুলোকে বেছে নিয়েছে। জ্বালানি তেল আমদানি বাড়ায় দেশটি থেকে এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়েছে চীন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় রাশিয়ান প্লান্টগুলো থেকে আমদানি লক্ষণীয় মাত্রায় কমেছে। এর মধ্যে জুনে আমদানি করে ১১ মাসের সর্বনিম্নে নেমেছে। 

দক্ষিণ কোরিয়ার ইউটিলিটিগুলো বর্তমানে রাশিয়ান এলএনজি আমদানি করছে না। অন্যদিকে জাপানের অন্তত দুটি ইউটিলিটি রাশিয়া থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইউক্রেনে হামলার জবাবে রাশিয়ার ওপর বেশ কয়েক ধাপে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো। আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং খাত, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে জ্বালানি তেলের খাতও। গত বছরের শেষ দিকে রুশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ বছরের শুরুর দিকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় পরিশোধিত পণ্যের ওপর। 

তবে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি রফতানি এখন পর্যন্ত কোনো রকম নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েনি। এর পর ক্রেতারা ভবিষ্যতে কোনো ধরনের পেমেন্ট বা ডেলিভারি সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে আমদানি কমিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া আমদানিতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসাও এর পেছনে অন্যতম কারণ।  

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া রাশিয়ার সঙ্গে কিছু দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি নবায়ন করেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশির ভাগ দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতারা বর্তমানে সাখালিন ২ প্রকল্প থেকেই এলএনজি কিনছে।  

প্রসঙ্গত, প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার ২০২১ সাল থেকেই সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ অবস্থায় উন্নতি হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন কমে যাওয়া, মজুদের নিম্নমুখী চাপ ও বৈরী আবহাওয়াকে এর পেছনে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের পর রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানির পরিবর্তে এলএনজি আমদানিতে মনোযোগ বাড়াচ্ছে ইউরোপ।

এলএনজির বৈশ্বিক বাণিজ্যের যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) পাঁচ বছরে ৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৮ সালে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ৪০ লাখ টন। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৭০ লাখ টনে। এ প্রবৃদ্ধিতে রসদ জুগিয়েছে ইউরোপ এবং চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো। এ সময় বৈশ্বিক সরবরাহের দুই-তৃতীয়াংশ অবদানই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার।

২০২৭ সাল নাগাদ এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদায় যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময় চাহিদা বাড়াতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে ইউরোপের দেশগুলো। 

এদিকে চীনে ২০২৭ সাল নাগাদ চাহিদা প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তায় তীব্র আকার ধারণ করেছে। কভিড-১৯ প্রতিরোধে আরোপ করা ‍সব ধরনের বিধিনিষেধ উঠিয়ে নিলেও দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি এখনো অনেক শ্লথ।

২০২৩-২৫ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ টন এলএনজির নতুন সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এ সময় গ্যাসের বৈশ্বিক বাজার সংকুচিত থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৬-২৭ সাল নাগাদ ১০ কোটি টনের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। নতুন সক্ষমতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই যোগ করবে ৫০ শতাংশ। এ তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকবে রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া।