কৃষ্ণসাগরীয় খাদ্যশস্য চুক্তির সমাপ্তি ঘটলে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম ফের লাগামছাড়া হয়ে পড়তে পারে। এতে হর্ন অব আফ্রিকার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আবারো লাগাম হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। খবর রয়টার্স।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম নজিরবিহীন বেড়ে যায়। রুশ সামরিক বাহিনীর অবরোধের মুখে খাদ্যশস্যে সমৃদ্ধশালী ইউক্রেন কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর ব্যবহার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এতে দেশটির খাদ্যশস্য রফতানি তলানিতে নেমে আসে। ফলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে অনেক দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসে। পরিস্থিতি সামাল দিয়ে গত বছরের জুলাইয়ে কৃষ্ণসাগরীয় খাদ্যশস্য চুক্তির উদ্যোগ নেয় জাতিসংঘ ও তুরস্ক। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ায় কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর দিয়ে ফের স্বাভাবিক হয়ে ওঠে খাদ্যশস্য ও সংশ্লিষ্ট পণ্য। তবে সম্প্রতি এ চুক্তি অনিশ্চয়তার মুখে।
সম্প্রতি রাশিয়া চুক্তিটি থেকে বের হয়ে আসার হুমকি দিয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে খাদ্যশস্য ও সার রফতানিতে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে তা নিরসন না করা হয়ে চুক্তির মেয়াদ বাড়াবে না বলে জানিয়েছে মস্কো। আগামী ১৮ জুলাই চুক্তির মেয়াদ সম্প্রসারণ নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইউক্রেনের সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ বৈঠকেই রাশিয়া চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেবে বলে তারা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ নিশ্চিত।
জাতিসংঘ জানায়, হর্ন অব আফ্রিকার দেশগুলোয় এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে দুর্ভিক্ষের প্রভাব কিছুটা লাঘব হয়েছে। তবে এখনো অঞ্চলটির ছয় কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। খাদ্য সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের সিনিয়র ইমার্জেন্সি অফিসার ডমিনিক ফেরাট্টি বলেন, ‘কৃষ্ণসাগরীয় চুক্তি নবায়ন করা না হলে পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অঞ্চলটির অনেক দেশ ইউক্রেনের গমের ওপর নির্ভরশীল। সেখান থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে খাদ্যপণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক আমদানি ব্যয় চলতি বছর রেকর্ড সর্বোচ্চে উন্নীত হতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। একদিকে ক্রমবর্ধমান চাহিদা অন্যদিকে খাদ্যপণ্যের বাড়তি দামকে এর পেছনে দায়ী করছে সংস্থাটি।
এফএও সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৩ সালে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক আমদানি ব্যয় ২০২২ সালের তুলনায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন ডলারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি দামের কারণে ২০২৩ সালে খাদ্যপণ্য আমদানি বাবদ বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ হাজার ৮৪০ কোটি ডলার। সরবরাহ খাতে ব্যয় হবে অতিরিক্ত ১ হাজার ২৯০ কোটি ডলার। তবে জাতিসংঘের সংস্থাটি জানায়, গত বছরের তুলনায় এবার আমদানি ব্যয় বাড়ার গতি থাকবে কিছুটা ধীর। ২০২২ সালে আমদানি ব্যয় বেড়েছিল ১১ শতাংশ ও ২০২১ সালে ১৮ শতাংশ।
সংস্থাটি বলছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তি। মূলত ফল, সবজি, চিনি ও দুগ্ধপণ্য দাম বাড়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। বেশি দামের কারণে অর্থনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশগুলোয় চাহিদা বৃদ্ধির হার কম। এ কারণেই গত বছরের তুলনায় আমদানি ব্যয় বাড়ার গতিও শ্লথ।
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে কমতে পারে। নিট আমদানিকারক উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আমদানি ব্যয় ৪ দশমিক ৯ শতাংশ কমতে পারে। তবে অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়ছে লাফিয়ে। উভয় অর্থনীতির দেশগুলোয় আমদানি কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। বিষয়টি দেশগুলোর ক্রয়সক্ষমতা কমে যাওয়ার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।










