ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে শ্রীলংকা। বিশাল অংকের বিদেশী ঋণ এরই মধ্যে পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ঋণ। 

দেশটিতে শতকোটি ডলারের জ্বালানি তেল প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে চীন। বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন শ্রীলংকার বৃহত্তম ঋণদাতা। দেশটির মহাসড়ক, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরসহ বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোয় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে চীন। শ্রীলংকার ঋণ পোর্টফোলিওতে চীনের অংশ এখন অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি। তুলনামূলক বাড়তি সুদের এ ঋণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় দেশটি অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরো ঝুঁকিগ্রস্ত হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে শ্রীলংকা নতুন করে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে। 

গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত শ্রীলংকা অবকাঠামো গড়তে ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ বিদেশী ঋণ নিয়েছে। চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে (বিআরআই) দেশটি যুক্ত হয় ২০১৩ সালে। সে সময় থেকে এ পর্যন্ত শ্রীলংকায় বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে চীন। বেইজিংয়ের দেয়া ঋণে গৃহীত প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক না হয়ে শ্রীলংকার জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠবে বলে বিভিন্ন সময় সমালোচনা করেছেন পশ্চিমা বিশ্লেষকরা।

যদিও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র গত বছর বলেছিলেন, ‘‌আমরা কাউকে ঋণ নিতে বাধ্য করিনি। কোনো দেশকে ঋণ নেয়ার জন্য চাপ দিইনি। আমরা ঋণ চুক্তিতে কোনো রাজনৈতিক শর্তারোপ করি না। ঋণের বিনিময়ে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য আমাদের নেই।’

সম্প্রতি শ্রীলংকার ৩ হাজার ৬৪০ কোটি ডলার বকেয়া ঋণ পুনঃতফশিল করার ইঙ্গিত দিয়েছে চীন। একই সঙ্গে দেশটিতে সরাসরি বিনিয়োগও বাড়িয়েছে। গত বছরের নভেম্বরের শেষের দিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর হাম্বানটোটায় ৪৫০ কোটি ডলারে একটি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে শ্রীলংকা। এতে অর্থ বিনিয়োগ করবে চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সিনোপেক। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতা পেতে শুরু করার পর শ্রীলংকায় এটি একক বৃহত্তম বিনিয়োগ। 

এ বিষয়ে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব পাবলিক পলিসির অধ্যাপক তোশিরো নিশিজাওয়া সম্প্রতি নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ‘‌জ্বালানি ঘাটতির সঙ্গে দেশের অন্যান্য সমস্যা জড়িত। যদি হাম্বানটোটায় চীনা বিনিয়োগ সফল হয়, তাহলে শ্রীলংকার দীর্ঘদিনের জ্বালানি সমস্যা কেটে যাবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ শ্রীলংকার একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে পারছে না।’

অর্থনীতিবিদরা জানান, কয়েক বছর আগে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে পরিশোধন ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করে শ্রীলংকা। সে প্রচেষ্টা চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কলম্বো সে সময় ভারত ও"চীনের আধিপত্য বিস্তারের ঝুঁকি এড়াতে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ পেয়েছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে শ্রীলংকায় চীনা প্রভাব মোকাবেলায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানি এরই মধ্যে কলম্বোয় নতুন কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। এতে ৫৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঋণ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

লন্ডনের ওভারসিজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের সাবেক পরিচালক গণেশান উইগনারাজা বলেছেন, ‘‌শ্রীলংকার জ্বালানি নিরাপত্তা ও ডলার সংকটকে প্রকট করে তুলেছে ২০২২ সালের ঋণ সংকট।’

গত বছরের অক্টোবরে শ্রীলংকাকে দেয়া ঋণের প্রায় ৪২০ কোটি ডলার পুনঃতফসিল করে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না। এটি শ্রীলংকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ২৯০ কোটি ডলার অনুমোদিত ঋণ প্যাকেজের দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের অধ্যাপক ডেবোরা ব্রাউটিগাম বলেন, ‘শ্রীলংকার অর্থনীতি স্থিতিশীল হলে চীনা বিনিয়োগ আরো বাড়বে।’