দীর্ঘসময় ধরেই অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার। প্রধানত শিল্প খাতে ব্যবহূত ধাতব পণ্য, কয়লা ও সয়াবিনের বাজারে অস্থিতিশীলতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। সহসাই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটবে না মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। মূলত চীনে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট পণ্যবাজারের অস্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি করে তুলছে।
বৈশ্বিক শিল্প ধাতু ও কয়লা উৎপাদন এবং ব্যবহারে শীর্ষস্থানীয় চীন। এসব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদার ৫০ শতাংশই আসে দেশটি থেকে। কিন্তু বর্তমানে চীনে বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।
পণ্যবাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফিচ সলিউশন জানায়, চীনের অর্থনীতিতে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার ও নির্মাণ শিল্প খাতে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ধাতব পণ্যের চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। গত বছরের এপ্রিল থেকেই চাহিদা ও দাম বাড়তে শুরু করে। এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে আকরিক লোহা, তামা ও টিনের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ বেড়েছে।
ডাচ বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক আইএনজির অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক আর্ম থিংক জানান, বিদ্যুৎ ও সরবরাহ সংকট ধাতব পণ্যের বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে। ক্রমেই বিদ্যুৎ সংকট বাড়ছে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ধাতব পণ্য উৎপাদকরা। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরবরাহ চক্রেও।
ফিচ সলিউশন জানায়, প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই চীনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে দেশটির রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান এভারগ্র্যান্ড বর্তমানে বেশকিছু অর্থনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে। বিনিয়োগকারী ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে অর্থ ফেরত দেয়া নিয়ে সমস্যায় পড়েছে। ফলে যেসব গ্রাহক গৃহনির্মাণের জন্য অর্থ পরিশোধ করেছেন তাদের যথাসময়ে গৃহ হস্তান্তর করা যাচ্ছে না। কোম্পানিটি প্রত্যক্ষভাবে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহূত ধাতব পণ্যের চাহিদায় প্রভাব ফেলছে। ইন্ধন জোগাচ্ছে মূল্যবৃদ্ধিতেও। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ সংকট ধাতব পণ্যের বাজারকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
আর্ম থিংক জানান, বিদ্যুৎ সংকট বাাজরে দ্বিমুখী প্রভাব তৈরি করেছে। এটি ধাতব পণ্যের দামের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু এ সংকট প্রক্রিয়াজাতে যুক্ত ভোক্তাদের প্রভাবিত করছে, যা দামের জন্য নেতিবাচক।
এভারগ্র্যান্ড ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চলতি সপ্তাহে নিকেল, টিন ও দস্তার মতো ধাতব পণ্যগুলোর দাম কমেছে। কিন্তু ক্রমাগত বাড়ছে ব্যবহারিক ধাতু অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাতের দাম।
ফিচ সলিউশন জানায়, চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত পণ্যবাজারে অস্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। চীনের এভারগ্র্যান্ড কোম্পানির সংকট কাটার আগ পর্যন্ত এ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান লুইস ড্রেইফাস কোম্পানির (এলডিসি) প্রধান নির্বাহী মিকাইল গেলচি সম্প্র্রতি রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে জানান, বিশ্ববাজারে কৃষিপণ্যের দাম সর্বাধিক বেড়েছে। ২০১০-১১ সালের আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার ও বর্তমান পণ্যবাজারের মধ্যে আমূল পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এখন দৃশ্যপট ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতার দিকে মোড় নিচ্ছে।
নভেল করোনাভাইরাসের একের পর এক ধাক্কা পণ্যবাজারকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মুদ্রা সহায়তা কমে যাওয়ার প্রশ্নে বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। কার্গো জট, কনটেইনার সংকট, উচ্চমাত্রার পরিবহন ব্যয়সহ নানা প্রতিবন্ধকতা তো রয়েছেই। গেলচির ভাষ্য, এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে সহসাই স্বাভাবিক হচ্ছে না পণ্যের সরবরাহ চক্র। এ বছর জ্বালানিসহ সব ধরনের পণ্যেরই অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বর্তমানে বিশ্বের নিম্ন কার্বন অর্থনীতিতে স্থানান্তরের ইংগিত দিচ্ছে।
সূত্র: দ্য হিন্দু বিজনেস লাইন










