বোয়িংয়ের মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের পুরো এভিয়েশন শিল্পে প্রভাব ফেলেছে। এ কারণে প্রধান কয়েকটি এয়ারলাইনস সংস্থা শিডিউলে কাটছাঁটের পাশাপাশি স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে নতুন নিয়োগ। সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন একাধিক ফ্লাইট পরিষেবা সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা। খবর সিএনবিসি।
পরপর ঘটা কয়েকটি দুর্ঘটনার কারণে একাধিক সংস্থার তদন্তের মুখে রয়েছে বোয়িং। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ৫ জানুয়ারি। এদিন মাঝ আকাশে আলাস্কা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট থেকে খুলে পড়ে প্যানেল। যার জের ধরে সুরক্ষা মান নিয়ন্ত্রণে উড়োজাহাজ নির্মাতা জায়ান্টটির গাফিলতি পায় ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)।
এসব ঘটনার প্রভাব পড়েছে বোয়িংয়ের ক্রয়াদেশ ও সরবরাহে। উড়োজাহাজ সংস্থাটির বড় গ্রাহকরা পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে নিজেদের বার্ষিক পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাসে বাধ্য হচ্ছেন। বেশকিছু এয়ারলাইনসের সিইও জানান, বোয়িংয়ের গুণমান নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, নতুন মডেলের অনুমোদনের বিলম্ব ও সরবরাহের ধীরতার কারণে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
যাত্রী পরিষেবার জন্য শুধু বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সের ওপর নির্ভর করে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস। বর্তমান সরবরাহ জটিলতায় যাত্রী ধারণক্ষমতার পূর্বাভাসে কাটছাঁটে বাধ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালের আর্থিক পূর্বাভাস পুনঃমূল্যায়নও করেছে তারা। সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস জানায়, এ বছর প্রত্যাশার তুলনার কম সরবরাহ পেতে যাচ্ছে তারা। ৭৯টির ক্রয়াদেশ থাকলেও চলতি বছর তাদের হ্যাঙ্গারে আসতে পারে ৪৬টি উড়োজাহাজ।
সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপিমরগান আয়োজিত এক সম্মেলনে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনসের সিইও বব জর্ডান বলেন, ‘বোয়িংকে সরবরাহ ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে।’
সাম্প্রতিক তদন্তে সুরক্ষা নীতি তৈরির জন্য বোয়িংকে সময় বেঁধে দিয়েছে এফএএ। এছাড়া ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ। সব মিলিয়ে নজরদারি ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে পূর্বাভাস অনুযায়ী উড়োজাহাজ সরবরাহ করতে পারবে না বোয়িং। এ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আলাস্কা এয়ারলাইনস। জানুয়ারির ঘটনায় এ সংস্থাই ভুগেছে বেশি। কোম্পানিটির বোয়িংয়ের বহর অলস বসিয়ে রাখতে হয় প্রায় তিন সপ্তাহ। সংস্থাটি জানায়, ২০২৪ সালের সামগ্রিক ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে কোম্পানিটি অনিশ্চয়তার মাঝে পড়ে গেছে।
আলাস্কার পাশাপাশি জানুয়ারিতে অনেক ফ্লাইট বাতিল করেছিল ইউনাইটেড এয়ারলাইনস। এ সংস্থার সিইও স্কট কিরবি জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যয়নপত্র না পাওয়ায় বোয়িং ম্যাক্স টেন সরবরাহ করতে পারবে না। বোয়িংকে এ মডেলের উড়োজাহাজের বদলে ম্যাক্স নাইন উৎপাদনের অনুরোধ করেছেন তারা।
বোয়িং নতুন মডেলের মধ্যে আলোচনায় রয়েছে ম্যাক্স টেন। এ মডেলের জন্য ক্রয়াদেশের পরিমাণও বেশি। কিন্তু ম্যাক্স টেন শিগগিরই অনুমোদন পাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্কট কিরবি আরো জানান, ম্যাক্স টেনের অনুমোদনে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস নতুন করে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। এরই মধ্যে মে ও জুন মাসের পরিকল্পিত পাইলট নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে একটি ই-মেইল বিবৃতিতে বোয়িং জানিয়েছে, উৎপাদন ব্যবস্থার গুণমান বৃদ্ধিতে গ্রাহকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছে তারা। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্চ মানের উড়োজাহাজ সরবরাহের ওপর মনোযোগ দিচ্ছে।
বোয়িংয়ের সিইও ডেভ ক্যালহাউন ও অন্য কর্মকর্তারা এরই মধ্যে মান নিয়ন্ত্রণে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একাধিকবার উৎপাদন বন্ধ রেখে কর্মীদের সঙ্গে সুরক্ষা বিষয়ে আলাপ করেছেন তারা।
বোয়িংয়ের সিইও স্ট্যান ডিল সম্প্রতি কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপকে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করতে হবে এবং নিরাপত্তাবিষয়ক ঝুঁকির জন্য সতর্ক থাকতে হবে।’
নিরাপত্তা ঝুঁকিসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য সরাসরি কর্তৃপক্ষকে জানাতে কর্মীদের অনুরোধও করেন তিনি।
প্যানেল খুলে যাওয়া ছাড়াও ৭৩৭ ম্যাক্স নাইন উড়োজাহাজের জানালায় ফাটল ও অন্য একটি ফ্লাইটের ইঞ্জিনে আগুন লেগে যায়। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে জানুয়ারিতে বোয়িং উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ ও সরবরাহ কমেছে। একই সঙ্গে ২০১৮ ও ২০১৯ সালের দুটি দুর্ঘটনার কথা ঘুরেফিরে আসছে। ওই দুটি ঘটনায় কয়েকশ যাত্রী নিহত হন।










