উষ্ণায়নের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু সংকটের অভিঘাত ভোগ করছে বিশ্ব। এর বিপরীতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর দাবিতে উচ্চকিত বৈশ্বিক ফোরামগুলো। পিছিয়ে নেই ইউরোপীয় কমিশনও, তাদের রয়েছে নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। এর আওতায় ২০৩০ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নে মোট সরবরাহে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সর্বনিম্ন লক্ষ্যমাত্রা হলো ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। এ লক্ষ্য পূরণে অন্যতম উপায় হলো বায়ুবিদ্যুতের ক্ষমতা বৃদ্ধি, বার্ষিক ৩১ গিগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ যোগ করতে হবে গ্রিডে। কিন্তু সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে রয়েছে ওই অঞ্চলের দেশগুলো। খবর ইউরো নিউজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণের পথে কিছুটা এগিয়েছেও দেশগুলো। যেমন ২০২২ সালে মহাদেশজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক উইন্ড ফার্ম বা বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল, যা ২০২১ সালের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন সতর্ক করেছে যে ইউরোপ এখনো তার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে।
গত বছর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ঘোষিত হয় ‘উইন্ড পাওয়ার প্যাকেজ’। ডিসেম্বরের এ সম্মেলনে ২৬টি সদস্য দেশের জ্বালানিমন্ত্রীরা নিজ নিজ দেশে উইন্ড ফার্ম বাড়ানো ও সরবরাহ ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ‘ইউরোপিয়ান উইন্ড চার্টারে’ স্বাক্ষর করেনি হাঙ্গেরি। এ প্যাকেজের উদ্দেশ্য হলো বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাড়ানো, সরবরাহ ব্যবস্থার অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে সৃষ্ট সমস্যার হ্রাস এবং বন্দর ও গ্রিডে বিনিয়োগ।
উত্তর বেলজিয়ামে অবস্থিত জেডএফ উইন্ড পাওয়ার বায়ুবিদ্যুতের টারবাইনের অতিপ্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ গিয়ারবক্স তৈরিতে অগ্রগণ্য প্রতিষ্ঠান। কোম্পানির সিইও ফেলিক্স হেনসেলার জানান, এখনো লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উইন্ড ফার্ম স্থাপনে দেশগুলো পিছিয়ে রয়েছে। এ কারণে যন্ত্রাংশ উৎপাদন বাড়ছে না। কারখানাগুলো সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবহার হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী যন্ত্রাংশ তৈরির মতো সক্ষমতা কারখানাগুলোর রয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী হলেও অসম্ভব নয়। সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আমাদের এখনই কাজ শুরু করতে হবে।’
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় উইন্ড টারবাইন প্রস্তুতকারক ভেসটাসের জন্য পাওয়ারট্রেন তৈরি করে জেডএফ উইন্ড পাওয়ার। ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠানটির গ্রুপ সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মর্টেন ডাইরহোমের মতে, ব্রাসেলসের সম্মেলনে নেয়া লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইউরোপে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
তার মতে, ইউরোপে নীতিনির্ধারকরা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে। তাই অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে।
বর্তমানে ইউরোপের বিদ্যুতের ১৭ শতাংশই আসে বায়ুশক্তি থেকে। গত বছর এ অঞ্চলে যুক্ত হয়েছে ১৭ গিগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ। বিদ্যুতের এ পরিমাণ পর্তুগালের গৃহস্থালি, বাণিজ্যিক ও শিল্পে ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের সমান। ইউরোপ চায় ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ুবিদ্যুৎ ক্ষমতা ৪৫১ গিগাওয়াটে উন্নীত করতে। বর্তমানে এ ক্ষমতা হলো ১৮০ গিগাওয়াট। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে আরো লম্বা পথ অতিক্রম করতে হবে। অন্যদিকে ২০৩০ সালের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করেছে ইইউ, আগের ৩২ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশ করেছে। সর্বনিম্ন হিসেবে এ লক্ষ্যমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। এ পরিমাণ বিদ্যুৎ পেতে ব্লকটিকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বর্তমান সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। সে হিসেবে বাড়াতে হবে বায়ুবিদ্যুতের সক্ষমতা।
এদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহজ হচ্ছে বলে জানিয়েছে উইন্ডইউরোপের সিইও জাইলস ডিকসন। তিনি বলেন, ‘নতুন উইন্ড ফার্মগুলোর পারমিট পাওয়া সহজ হচ্ছে। এর আগে আইনি ও আমলাতান্ত্রিক কারণে অনুমতি ছিল কঠিন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ বিষয়ে নতুন নিয়ম এনেছে। গত বছর জার্মানি ও স্পেন আগের বছরের তুলনায় উপকূলীয় অঞ্চলে ৭০ শতাংশ বেশি উইন্ড ফার্মের অনুমতি দিয়েছে।’
ডিকসন আরো জানান, টারবাইন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ তৈরিতে টেকসই পদক্ষেপ নিচ্ছে ইইউ। কম দাম ও তিন বছরের বাকিতে টারবাইন দেয়ার জন্য চীনা নির্মাতারা এগিয়ে এলেও প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। বায়ু টারবাইনের প্রয়োজনীয় উপাদানের জন্য চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইউরোপ। নাইওবিয়াম, লিথিয়াম ও কোবাল্টের মতো বিরল উপাদানগুলোর ৯৮ শতাংশই চীন থেকে আসে। সে নির্ভরতা কমাতে বিকল্প উৎসের দিকে মনোযোগ দিয়েছে ইউরোপ।










