কভিড-১৯ মহামারীর ধাক্কা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি বৈশ্বিক অর্থনীতি। এরই মধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয়েছে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ। এ দুটি যুদ্ধ আর কতদিন চলবে, তা কেউ বলতে পারছে না। পাশাপাশি আগামী বছর পৃথিবীর প্রায় ৫০টি দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি কেমন যাবে তা নিয়ে চিন্তিত অর্থনীতিবিদরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী বছর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হতে যাচ্ছে ভূরাজনীতি। যে গ্লোবাল ভিলেজের কথা এতদিন শোনা যেত, তা আর থাকছে না। বিভিন্ন দেশ আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ করবে। অভিভাসন নীতি আরো কঠোর হবে। বিভিন্ন দেশে নির্বাচনে ডানপন্থীরা ক্ষমতায় এলে সব মিলিয়ে এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি হবে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের পর লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজে হুথিদের হামলা এরই মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া ইসরায়েল-হামাস সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটা ঘটলে কভিড-১৯ মহামারী-পরবর্তী অপ্রত্যাশিত সংকটের মুখে পড়বে বিশ্ব। এটাকে বিশ্ব অর্থনীতির বুকে ভালুকের থাবা মারার সঙ্গে তুলনা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এটা একসময় প্রশমিত হলেও শেষ পর্যন্ত দাগ রেখে যাবে।
এছাড়া রয়েছে জাতীয় নির্বাচনের ঢেউ, যার প্রভাব গভীর ও দীর্ঘ হতে পারে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ২৭টিসহ প্রায় ৫০টি দেশের ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ ভোটে অংশ নেবে। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা বৈশ্বিক উৎপাদন খাতে ৬০ শতাংশ অবদান রাখেন। বিভিন্ন দেশে সরকারের প্রতি অবিশ্বাস বাড়ছে। ভোটাররা বিভক্ত এবং অর্থনীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ লক্ষ করা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা জানান, যেসব দেশে অবাধ বা সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, সেসব দেশেও রাজনৈতিক দলের নেতারা অর্থনীতির প্রতি সংবেদনশীল। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী মার্চে রাশিয়ায় নির্বাচনের আগে রফতানিকারকদের মুদ্রা রুবলে রূপান্তর করতে বলেছেন। নির্বাচনে বিজয়ীরা কারখানায় ভর্তুকি, শুল্ক অব্যাহতি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, নিয়ন্ত্রণ সহজীকরণ, বাণিজ্য বাধা দূর, ঋণ ছাড় ও জ্বালানি খাতে পরিবর্তনকে প্রভাবিত করে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। জনপ্রিয় নেতারা ক্ষমতায় গেলে বাণিজ্য, বিদেশী বিনিয়োগ ও অভিবাসন বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির অধ্যাপক ডায়ান কোয়েল বলেছেন, ‘এ ধরনের নীতি বিশ্ব অর্থনীতিকে আমাদের পরিচিত রূপের বাইরে একেবারে আলাদা রূপ দিতে পারে।’
অনেক দেশে আয় বাড়ছে না, জীবনযাত্রার মান ক্রমে খারাপ হচ্ছে এবং বৈষম্য বাড়ছে। এসব কারণে বিশ্বায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ডায়ান কোয়েল একে বলেছেন, সংকুচিত বাণিজ্যের বিশ্ব হলো সংকুচিত আয়ের বিশ্ব।
তিনি জানান, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরেকটি আশঙ্কা হচ্ছে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেন। এটা ঘটলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আরো দুর্বল হতে পারে।
অনেক অর্থনীতিবিদ সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ঘটনাগুলোকে ১৯৭০-এর দশকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু ডায়ান কোয়েল মনে করেন, সেটি ১৯৩০-এর দশক ছিল। যখন রাজনৈতিক উত্থান ও আর্থিক ভারসাম্যহীনতা জনপ্রিয় নেতা তৈরি করেছিল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কমেছিল।
আগামী বছর ভারতে নির্বাচন। বর্তমানে বিশ্বের দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ এটি। বৈশ্বিক পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জানুয়ারিতে তাইওয়ানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। মেক্সিকোর নির্বাচন বিদেশী বিনিয়োগের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার নতুন রাষ্ট্রপতি নিকেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে নীতি পরিবর্তন করতে পারেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন।
ভোটার টানতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা এরই মধ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়া শুরু করেছেন।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি জরিপ প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘আগামী বছর বিশ্বজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতে এক অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে।’










