বিশ্বের ১৪০টি দেশে একযোগে আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থা চালু হচ্ছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। এর মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ কর ধার্য করেছে বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলো। এটা সম্ভব হলে বড় বহুজাতিক কোম্পানির বার্ষিক কর বেড়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার কোটি ডলারে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

ইন্টারলকিং (পারস্পরিক) নিয়মের অধীনে একটি বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা নির্ধারিত হারের (ইনকাম ট্যাক্স) নিচে হলে অন্য দেশের প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে টপ-আপ (আয় ব্যয় যা হোক, কর প্রদান বাধ্যতামূলক) কর আরোপ করা যাবে।

৩৮টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) পূর্বাভাস দিয়েছে, এ বছর বিশ্বব্যাপী বার্ষিক কর ৯ শতাংশ বেড়ে ২২ হাজার কোটি ডলার হবে।

নীতিনির্ধারণী সংস্থা সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্স অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড রিসার্চের প্রধান বিশ্লেষক জেসন ওয়ার্ড বলেছেন, ‘‌কর ব্যবস্থায় সংস্কারের পদ্ধতিটি প্রশংসা করার মতো। বর্তমান পদ্ধতি কোম্পানিগুলোকে করস্বর্গ ব্যবহার করতে প্ররোচিত করবে না। একই সঙ্গে এ পদ্ধতি দেশগুলোকে করস্বর্গে রূপান্তর হতে দেবে না। কর আদায় তলানিতে ঠেকার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় নতুন পদ্ধতিতে তা অসম্ভব হয়ে উঠবে।

জানুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী ন্যূনতম কর কার্যকর করা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও কানাডা। নিয়মগুলো বহুজাতিক কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য হবে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির বার্ষিক আয় ৭৫ কোটি ইউরোর বেশি।

আয়ারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড ও বার্বাডোসসহ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশগুলোও নতুন পদ্ধতির কর কার্যকর করবে। এসব দেশে আগে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ করপোরেট কর ছিল।

২০২১ সালে চুক্তি সমর্থন করা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কেউই নতুন করনীতি কার্যকর করার জন্য আইন প্রবর্তন করেনি।৷তবে বিশ্বব্যাপী নতুন এ কর ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কর বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০২১ সালে ওইসিডির তত্ত্বাবধানে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি দুটি লক্ষ্যের”ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথম লক্ষ্য হলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে যেখানে তারা ব্যবসা করে, সেখানে আরো বেশি কর দিতে হবে। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী সর্বনিম্ন করপোরেট করের হার প্রতিষ্ঠা করা।

করপোরেট খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, একবার কয়েকটি দেশ বিশ্বব্যাপী করহার প্রবর্তন করলে অন্যান্য দেশও এটি কার্যকর করার জন্য উৎসাহ পাবে।

ওইসিডির সাবেক করপ্রধান প্যাসকেল সেন্ট আমান্স বলেছেন, ‘‌নতুন কর ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের সমর্থন প্রয়োজন। গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য এর চেয়ে সহজ কোনো পথ আমার জানা নেই।’

অর্থনীতিবিদরা জানান, অনেক কিছুর বাস্তবায়ন নির্ভর করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, যেসব দেশ নতুন করপোরেট কর কার্যকর করবে, সেসব দেশ সফল হবে। অতীতে করস্বর্গ হওয়ায় আয়ারল্যান্ডকে পুরস্কৃত করার প্রস্তাব উঠেছিল। বর্তমানে দেশটি অপ্রত্যাশিত পরিণতির জন্য অপেক্ষা করছে।

ওইসিডির কর প্রধান মানাল করউইন বলেছেন, ‘প্রাথমিকভাবে কতটা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হলো, তা ‌বের করতে পারলে সংস্কারের একটি চিত্র পাওয়া যাবে। এর ওপর নির্ভর করছে এ নীতিমালার ভবিষ্যৎ। যদিও”এ সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক সিস্টেমের ফাঁকফোকড় দূর করা। যাতে আরো কর আদায় করা যায়।’

পিডব্লিউসি ইউএসের গ্লোবাল ট্যাক্স পলিসি লিডার উইল মরিস বলেছেন, ‘‌বিনিয়োগ কেন্দ্রগুলো সম্ভবত নতুন নীতিমালার অধীনে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করবে, যা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ হবে। কর প্রতিযোগিতা শেষ হবে না। এটি ভর্তুকি ও ঋণে পরিণত হবে।’