গ্রেফতার হয়েছে হাজারো মানুষ। আগুনে পুড়েছে প্রায় ছয় হাজার গাড়ি। বিধ্বস্ত হয়েছে অগণিত দোকান। আগামী দিনগুলোয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলেও ঋণে ডুবে থাকা ফ্রান্সের জন্য নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বর্তমান ঘটনা যেন ফরাসি অর্থনীতিকে নেতিবাচক দিকেই নিয়ে যাবে। ফ্রান্সকে দেউলিয়া না বানালেও তাকে নিকটবর্তী করবে। এমনটাই উঠে এসেছে টেলিগ্রাফের প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ম্যাথিউ লিন জানিয়েছেন, ২০০৫ সালের পর থেকে ফ্রান্সে এমন বড় পরিসরে দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। দাঙ্গার রেশ আবার ফিরে আসবে কিনা সেটাও দেখার বিষয়। পেট্রল বোমা কিংবা মোলোটভ ককটেল ফ্রান্সের অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি করেছে এর মধ্যেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যানুসারে, প্রতি রাতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ গাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। বীমাকারীদের প্রাথমিক অনুমানে মোট ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ১০ কোটি ইউরো। বাস্তবিক সংখ্যাটি আরো বেশি। সপ্তাহব্যাপী দোকান বন্ধ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্থবিরতার অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়।
রাতের কারফিউ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রেস্তোরাঁ বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আগামী দিনগুলোয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কাটছে না। যুক্তরাজ্যসহ বেশকিছু দেশ ফ্রান্সে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। গ্রীষ্মকালকে মনে করা হয় ভ্রমণের মৌসুম, আর ফ্রান্স হলো বিশ্বের প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি। সেখানকার জিডিপির ১০ শতাংশই আসে পর্যটন খাত থেকে। বর্তমান অস্থিরতায় সেখানে বিপর্যস্ত হতে যাচ্ছে পর্যটনসংক্রান্ত অর্থনীতি। আবার যেহেতু সহিংসতার পরবর্তী সময়গুলোয় ব্যয় বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দেখা দিয়েছে অতীতের ফ্রান্সে। ২০০৫ সালে ঘটনার পর নিকোলাস সারকোজি ব্যয় কমাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আবাসন ও পরিবহন খাতের উন্নয়নে। ২০১৯ সালের বিক্ষোভের পর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জ্বালানি খাতে কর কমিয়ে দেয়ার কথা দিয়েছেন। বাড়িয়েছেন গ্রামীণ বিক্ষোভকারীদের সুবিধা। ফলে আগামীতে সংকট নিরসনে বড় ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি শোনার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
তবে ফরাসি অর্থনীতি বিপর্যয়ের রাস্তা থেকে দ্রুত সরে আসতে পারছে না। দেশটির অর্থনীতি এক দশক ধরে নাটকীয়ভাবে নেতিবাচক দিকে চলছে। যুক্তরাজ্যের অবস্থা হয়তো খারাপ, কিন্তু ফ্রান্সের অবস্থা তার চেয়ে বেশি খারাপ। ডেট-টু-জিডিপির অনুপাত এর মধ্যেই ১১২ শতাংশে পৌঁছেছে, যুক্তরাজ্যে যা দাঁড়িয়েছে ১১ ও জার্মানিতে ৬৭ শতাংশে। চলতি দশকের পরবর্তী দিনগুলোয়ও বাড়তে থাকবে ঘাটতি। বাজেট ঘাটতি চলতি বছরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াবে। এমনকি মহামারী থেকে পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও অর্থনীতি ২০২৪ সালে বাজেট ঘাটতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থাকবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
উন্নত বিশ্বের মধ্যে ফ্রান্সের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ই জিডিপির ৬০ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। ট্যাক্স-টু-জিডিপির অনুপাত সেখানে ৪৫ শতাংশ।
কর বাড়ানোর সুযোগ নেই। বেশি ঋণের আশাও করা যাচ্ছে না। জাতীয় ঋণখেলাপিতে ইতালিকে ছাড়িয়ে গেছে দেশটি। ফ্রান্সের ঋণ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। পুনরুদ্ধার ও অর্থনীতি সম্প্রসারণের পথে নতুন ঝুঁকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে বর্তমান দাঙ্গা। এখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়াই সহজ হবে না প্রশাসনের জন্য। দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলা দেশের অর্থনীতিকে বড়সর আঘাত করতে পারে দীর্ঘস্থায়ীভাবে। ম্যাথিউ লিন বলেছেন, ‘ব্যয় বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে বিষফোঁড়া আকারে। হয়তো চলতি মাসে ঘটবে না, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেও না। তবে দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে উঠবে ফ্রান্সের অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।










