বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ, যারা আগে থেকেই টেনেটুনে জীবন চালাচ্ছিল, তারা এখন মূল্যস্ফীতির কড়া চাপে পিষ্ট হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের তুলনায় এখন আফ্রিকার অর্থনীতি অনেক বেশি সহনশীল ও প্রস্তুত। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা বেড়েছে আফ্রিকার দেশগুলোর। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক কেন ইয়ালা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানসংক্রান্ত উত্তেজনা বাড়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এতে আফ্রিকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে। অনেক পরিবার আগে থেকেই অল্প আয়ে চলছিল। এখন মূল্যস্ফীতির চাপ তাদের জীবনকে আরো কঠিন করে তুলেছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশ কয়েকটি সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ভর্তুকি দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বেশির ভাগ দেশের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সহায়তা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
উদাহরণ হিসেবে কেনিয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। দেশটি জ্বালানির ওপর ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর অর্ধেক করে দিয়েছে। ফলে দেশটির বাজেট ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে জিডিপির প্রায় ৭ শতাংশে। যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে কেবল কেনিয়ায়ই প্রায় ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানান কেন ইয়ালা।
জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যের দামও আফ্রিকার নীতিনির্ধারকদের বড় উদ্বেগের কারণ। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে সার পরিবহনে ব্যয় বেড়েছে। এতে সারের দামও বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর প্রভাব চলতি বছরের শেষ দিকে কৃষি উৎপাদনে পড়তে পারে। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যসংকট ও মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আফ্রিকার অর্থনীতি নিয়ে আগের মতো হতাশ নন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, বিশ্বে বড় কোনো সংকট দেখা দিলেই আফ্রিকার পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিতভাবে নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়। অথচ বাস্তবতা এখন অনেক বদলে গেছে।
১৯৮০-এর দশকে বিশ্ব ঋণ সংকটের সময় আফ্রিকার অনেক দেশ ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। সে সময় পণ্যমূল্যের উল্লম্ফনের পর হঠাৎ মন্দা শুরু হয়। ফলে আফ্রিকার অনেক দেশে দীর্ঘ সময় অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেয়। কিছু দেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, তখন আফ্রিকার অনেক দেশ স্বাধীনতার মাত্র দুই দশক পার করেছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা কম ছিল। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা বা জনগণকে সহায়তা দেয়ার মতো শক্তি সরকারের ছিল না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব ঋণ সংকটের সময় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপেও অনেক দেশকে কঠোর কাঠামোগত সংস্কারে যেতে হয়। এতে সরকারি ব্যয় কমানো হয়। জনসেবা সংকুচিত করা হয়। অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকোচন তৈরি হয়। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর খুব নেতিবাচকভাবে পড়ে।
তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ২৫ বছরে আফ্রিকার দেশগুলো একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কা সামাল দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, চীনের নেতৃত্বে পণ্যবাজারের উত্থান-পতনের সমাপ্তি, কভিড-১৯ মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।
চারটি বড় সংকটেও আফ্রিকার অধিকাংশ অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। অনেক দেশ দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ইরান–সংকট শুরুর আগে ধারণা করা হয়, ২০২৬ সালে আফ্রিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এশিয়াকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আফ্রিকার অর্থনীতি এখন বেশি শক্তিশালী। ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর শুরুর দিকের সংস্কারগুলো অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে যেভাবে অতিরিক্ত অর্থ ছাপিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ানো হতো, এখন তা অনেক কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক ভালো কাজ করছে।









