একজন উদ্যোক্তা ও ব্যাংক চেয়ারম্যান হিসেবে দেশের অর্থনীতির বিরাজমান পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে নবনির্বাচিত সরকার সে অবস্থার উন্নতির জন্য কী পদক্ষেপ নেবে, তার ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ চুক্তির আওতায় চলতি বছর যে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা, সেটি তারা দিচ্ছে না বলে খবর বেরিয়েছে। ঋণ দেয়ার জন্য আইএমএফ যেসব শর্ত দিয়েছে ও দিচ্ছে, সেগুলোর কারণে জনগণের ভোগান্তি আরো বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংক খাত সংস্কারে নেয়া পদক্ষেপের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ভুল ছিল। অর্থনীতিতে করপোরেট পুনর্গঠনের কিছু পদ্ধতি আছে। মার্জার, অ্যাকুইজিশন, অ্যামালগ্যামেশন, ডিসলিউশন এসব পদ্ধতির অন্যতম। কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানে সংকট দেখা দিলে আপনাকে এসবের কোনো একটি পদ্ধতিতে যেতে হবে। তার মানে এই নয় যে আপনি একসঙ্গে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেবেন। এতগুলো ব্যাংককে একসঙ্গে একীভূতকরণ করার কোনো অর্থই হয় না। কোনো ব্যাংক খারাপ করলেও প্রথম কর্তব্য হলো আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা। কিন্তু একীভূতকরণের ফলে এ ব্যাংকগুলোতে মানুষ আর টাকা রাখতে যাবে না। বরং জমাকৃত টাকা তুলে নিয়ে যাবে। এখানে বরং দরকার ছিল আরো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া। যেসব ব্যাংক কাজ করতে পারছে না, সেগুলো সোজা বন্ধ করে দেয়া উচিত। এগুলো টিকতে পারবে না।
বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠনের সভাপতি হিসেবে সে সময় আপনি কী ভূমিকা রেখেছিলেন?
আমি তৎকালীন গভর্নরকে বেশ কয়েকবার সতর্ক করেছি। হ্যাঁ, ব্যাংকগুলোয় অনেক সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু এদের মধ্যে অনেকেই ভালো উদ্যোক্তা ছিলেন; যারা ব্যাংকগুলোকে পুনরায় দাঁড় করাতে পারতেন। যেমন এক্সিম ব্যাংক ও এসআইবিএল বাঁচানো যেত। এছাড়া ব্যাংকগুলোর দুরবস্থা যারা তৈরি করেছেন, তারা তো তখন প্রভাব বিস্তারের অবস্থায় ছিলেন না। আগে ওপর মহলের সমর্থন ছিল বলে পর্ষদে অন্য পরিচালকরা কথা বলতে পারতেন না। এখন সময় এসেছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে এগুলো ঠিক করার।
এ পাঁচটি ব্যাংকের বাইরেও তো সরকারি-বেসরকারি আরো অনেক ব্যাংক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে...
সরকারি ব্যাংকের বিষয়ে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকেরই কোনো দৃষ্টি নেই। শুধু বেসরকারি ব্যাংকগুলো কী করছে সেটা দেখছে। কিন্তু সরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে যে বিশাল আকারের জাতীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। সরকারের প্রথম উদ্যোগ হওয়া উচিত, এসব ব্যাংকের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পর্ষদে অর্ধেক পরিচালক স্বতন্ত্র হিসাবে নিতে বলা হয়। আমি বলব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া ভালো স্বতন্ত্র পরিচালকদের দিয়ে আগে সরকারি ব্যাংকগুলো ঠিক করা দরকার।
এ বিষয়ে সরকারের কাছে আপনার সুস্পষ্ট কী দাবি থাকবে?
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালক উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকেই হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ যত বেশি হবে, সংকটও তত বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব হলো ব্যাংক যাতে রীতিনীতি মেনে সঠিক পথে চলে, সেটি নিশ্চিত করা। কোনো ব্যাংক যদি চলতে না পারে, সেটিতে স্বতন্ত্র পরিচালক না দিয়ে বন্ধ করে দেন।
সম্প্রতি সংসদে সংশোধনীসহ ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ পাস হয়েছে। যেখানে একীভূত ব্যাংক পুনরায় আগের মালিক বা পরিচালকদের হাতে ফেরতের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আমি মনে করি, যেসব ব্যাংক একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেছে, সেগুলো বন্ধ করে দেয়া উচিত। কারণ সেগুলো চালানো সম্ভব নয়। হয়তো দু-একটি ব্যাংক (যেমন এক্সিম ব্যাংক) যদি পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়, তবে তারা সেটা ঠিক করতে পারবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল। আইনের খসড়া চূড়ান্তও হয়েছিল। কিন্তু আপনাদের বিরোধিতার কারণে সেটি আটকে গেছে?
হ্যাঁ, ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনের যে চেষ্টা হয়েছিল, সেটির আমরা বিরোধিতা করেছিলাম। এ কারণে আইনের সংশোধনী আটকে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বলেছিলাম, এ পরিবর্তনগুলো নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করা উচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন কোনো আইন প্রণয়ন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নয়। এখনকার মূল কাজ হওয়া দরকার সব বিশৃঙ্খলা গুছিয়ে আনা এবং আর্থিক খাতের স্বার্থ রক্ষা করা।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও জনসংখ্যার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা কত হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। এটি একটি বড় সমস্যা। ভারতে ১৪৬ কোটি মানুষের জন্য ব্যাংকের সংখ্যা ৩০-এর মতো। আর আমাদের ১৮ কোটি মানুষের জন্য ব্যাংক ৬২টি। এটা একেবারেই অস্বাভাবিক। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যাংক খাতের আমূল সংস্কার জরুরি।
আসন্ন বাজেট নিয়ে বিএবি ও এবিবির পক্ষ থেকে এনবিআরের কাছে কী কী দাবি জানানো হয়েছে?
আমাদের প্রধান দাবি ট্যাক্স রিফর্ম। দেশে করপোরেট ট্যাক্স ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা বিশ্বের কোথাও নেই। আমরা এটি ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছি। বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি বেশ খারাপ। আমাদের কর-জিডিপি হার ৭ শতাংশের নিচে, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। সরকার নতুন করদাতা খোঁজার চেয়ে যারা নিয়মিত কর দেয়, তাদের ওপরই বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। এটি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো। বরং যেখান থেকে সরকারের অনেক বেশি রাজস্ব আয়ের সুযোগ আছে, সেদিকে নজর দেয়া উচিত। যেমন জমি রেজিস্ট্রেশনের মতো বড় বড় খাতগুলোকে একটি সেন্ট্রাল প্লাটফর্মে নিয়ে এসে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা বা বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
দেশের আইনি ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে ৬০ শতাংশ খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায় করা সম্ভব হতো। বাণিজ্যিক আইন শক্তিশালী করা দরকার। বর্তমানে আমরা যখন কোনো খেলাপি গ্রাহকের সম্পত্তি ক্রোক করতে যাই, তারা কোর্টে গিয়ে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে। এতে বছরের পর বছর সময় নষ্ট হয়। বিচার প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত যাতে একই লোক বারবার সুবিধা না পায়। যারা টাকা পাচার করে বিদেশে আছে, তারা যেন এখানে আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা লড়ার সুযোগ না পায়। তাদের সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ঢাকা ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ঢাকা ব্যাংক ভালো আছে। কিছু পুরোনো দায় আমরা ধীরে ধীরে গুছিয়ে আনছি। এখন খুব সতর্কভাবে ব্যাংক পরিচালনা করছি, যাতে কোনো ‘ব্যাড লোন’ তৈরি না হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা আপাতত বড় কোনো সম্প্রসারণ বা নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগের কথা ভাবছি না। সরকার নতুন এসেছে, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তবে আমরা ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দিচ্ছি। যদিও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে গেলে জনবল কম লাগবে, যা আমাদের মতো অধিক জনসংখ্যার দেশে একটি উদ্বেগের বিষয়।
আপনি দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের একজন বড় উদ্যোক্তা। আমরা দেখছি, দেশের এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাতই চাপে আছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও সরকারের কাছে প্রত্যাশা জানতে চাই।
বর্তমানে আমাদের প্রধান সমস্যা হলো বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অবকাঠামো। দেশে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে কারখানার সক্ষমতার মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি, বিদেশী বিনিয়োগ আনার জন্য সরকার তোড়জোড় চালাচ্ছে। নানা সম্মেলন আয়োজন করছে। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগ আসেনি। আমি মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশীদের পেছনে না দৌড়ে দেশী বিনিয়োগকারীরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন, তা আগে দেখা। দেশী বিনিয়োগকারীরা ভালো না থাকলে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে না। কারণ তারা এখানে ব্যবসা করতেই আসবে, সাহায্য করতে নয়।
নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট কেমন হতে পারে, এতে আপনার প্রত্যাশা কী?
বাজেটে বড় ঘাটতি থাকবে, এতে সন্দেহ নেই। তবে এ ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়া কমানো উচিত। সরকার যদি ব্যাংকের সব টাকা ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে নিয়ে নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। ৯ লাখ কোটি টাকার ওপর যে বাজেট হতে যাচ্ছে, তার অর্থায়ন পদ্ধতি নিয়ে আমরা এখনো অন্ধকারে। বাজেটের আগে অংশীজনদের সঙ্গে অক্টোবর-নভেম্বরেই আলোচনা শুরু করা উচিত ছিল। মে-জুনে এসে আলোচনা করলে বিশেষ সুফল পাওয়া যায় না।










