চরম বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে বিশ্বের প্রায় সব বৃহৎ তুলা সরবরাহকারী দেশ বিপাকে পড়েছে। আসন্ন দিনগুলোয় পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রধান কাঁচামালটির সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। স্পোকসম্যান রিভিউতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
তুলার সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ ভারত। ভারি বৃষ্টিপাত ও কীটপতঙ্গের আক্রমণে দেশটিতে তুলা উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন ঘাটতির পরিমাণ এতটাই তীব্র যে ভারত আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ চাহিদা মেটাতে বাধ্য হচ্ছে।
অন্যদিকে দাবদাহের কারণে চীনে আসন্ন তুলা উৎপাদন ও উত্তোলন নিয়ে আশঙ্কা চরম আকার ধারণ করেছে। পণ্যটির বৃহৎ রফতানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দেশটির তুলা আবাদি অঞ্চলগুলোর জন্য বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে তীব্র খরা। এতে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যটির উৎপাদন কমে এক দশকের সর্বনিম্নে নামার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্রাজিল বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ তুলা রফতানিকারক দেশ। প্রতিনিয়তই মাত্রাতিরিক্ত গরম ও খরার সঙ্গে যুদ্ধ করছে দেশটির কৃষি খাত। এরই মধ্যে দেশটিতে তুলা উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমার পূর্বাভাস মিলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়া আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দামকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। চলতি বছরের এখন পর্যন্ত পণ্যটির দাম বেড়েছে অন্তত ৩০ শতাংশ। বছরের শুরুর দিকে তুলার দাম ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চে উঠে আসে। এতে বিশ্বজুড়ে পোশাক সরবরাহ মার্জিন সংকুচিত হচ্ছে। পাশাপাশি টি-শার্ট থেকে শুরু করে ডায়াপার, কাগজ ও কার্ডবোর্ড পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পণ্য মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিতে পড়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিশু পোশাক পণ্যের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান চিল্ড্রেন প্লেসের সিইও জেন ইল্ফারস বলেন, তুলার বাজারদরে ঊর্ধ্বগতি আমাদের জন্য বড় ধরনের সমস্যা। প্রত্যাশিত স্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতির কারণে এ বছরের দ্বিতীয়ার্ধে কোম্পানিটি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
ব্রাজিলে তুলা উৎপাদন নিয়ে কোনো সম্ভাবনাই দেখছেন না বিশ্লেষকরা। ব্রাজিলের তুলা উৎপাদক অ্যাসোসিয়েশন অ্যাবরাপার দেয়া তথ্যানুযায়ী, খরার কারণে এরই মধ্যে লাতিন আমেরিকার দেশটিতে অন্তত দুই লাখ টন তুলা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটিতে ২০২১-২২ বিপণন মৌসুমে উৎপাদিত তুলা উত্তোলনের কাজ প্রায় শেষের পথে। দেশটিতে সব মিলিয়ে ২৬ লাখ টন বা তার চেয়ে কম তুলা উৎপাদনের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে তুলা উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। এ মৌসুমে দেশটিতে উৎপাদন ২৮ শতাংশ কমতে পারে। ২০০৯-১০ মৌসুমের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে দেশটির উৎপাদন। ফলে পণ্যটির মজুদ ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে আসবে। দেশটিতে খরা এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছে, সরকার কলরাডো নদীর পানি রেশনিং করতে শুরু করেছে।
বৈশ্বিক তুলা রফতানির অর্ধেকই আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল থেকে। কিন্তু দেশ দুটি বর্তমানে বৈরী আবহাওয়ার প্রতিবন্ধকতায় হিমশিম খাচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক তুলা রফতানিতে মন্দা দেখা দিতে পারে।
এদিকে তুলার বৈশ্বিক সরবরাহ অব্যাহত কমতে থাকায় উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে পণ্যটির চাহিদা। মার্কিন সরকার ও বিশ্লেষকদের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, অর্থনীতিতে শ্লথগতি এবং পোশাক ক্রয়ের পরিমাণ কমে যাওয়ায় চাহিদায় নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় চাহিদা কমার হার বেশি। তবে উৎপাদক কমে যাওয়াসহ বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি বলছে, চাহিদা কমলেও আগামী মাসগুলোয় পণ্যটির দাম আরো বাড়তে পারে।
এদিকে শুধু সরবরাহকারীরাই নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রেতাদের জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈরী আবহাওয়া। অতিবৃষ্টির কারণে অস্ট্রেলিয়া পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে তুলার মজুদ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।










