দেড় বছরেরও কম সময়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম রেকর্ড সর্বনিম্ন থেকে রেকর্ড সর্বোচ্চে উঠেছে। নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই জ্বালানি পণ্যটির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাপী এলএনজির চাহিদা ক্রমে বাড়তে থাকায় বর্তমানে অস্থিতিশীলতা আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। সহসাই বাজারে স্থিতি ফিরবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মহামারীর ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে পুনরুদ্ধার ঘটছে তারই ধারাবাহিকতায় এলএনজির চাহিদা বাড়ছে। পাশাপাশি উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে শীত মৌসুম সামনে রেখে চাহিদা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তবে চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন প্রতিবন্ধকতার কারণে পণ্যটির সরবরাহ কোণঠাসা হয়ে আছে।

বর্তমানে কয়লা সরবরাহ নিয়ে তীব্র সংকটের মধ্যে রয়েছে চীন। এ কারণে দেশটির বিভিন্ন প্রদেশজুড়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিষয়টি এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলছে। জ্বালানির উৎস নিশ্চিত করতে অঞ্চল দুটির মধ্যে প্রতিযোগিতা উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

এ প্রেক্ষাপট এলএনজির বাজারদরকে আকাশচুম্বী করে তুলছে। চলতি সপ্তাহে এক এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম দাঁড়িয়েছে ৩৪ ডলার। অথচ গত বছরের মে মাসে একই পরিমাণ এলএনজির দাম ছিল ২ ডলারেরও নিচে। এদিকে চলতি বছর ইউরোপের বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।

বৈশ্বিক এলএনজি আমদানির ৯৪ শতাংশই এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে যায়। এছাড়া বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহূত হয় তার এক-তৃতীয়াংশই ব্যবহার করে অঞ্চল দুটির দেশগুলো। কিন্তু বর্তমানে এসব দেশে এলএনজির মজুদ তলানিতে ঠেকেছে।

বেশির ভাগ শীর্ষ এলএনজি উৎপাদক মজুদ সক্ষমতা পরিপূর্ণ অথবা কাছাকাছি পর্যায়ে নিয়ে যেতে কাজ করছে। নির্দিষ্ট ক্রেতাদের জন্যই বেশির ভাগ এলএনজির চালান বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এটি বাজারে স্বল্পমেয়াদি সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

পণ্যবাহী জাহাজের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রেফিনিটিভ জানায়, চলতি বছরের এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ২৮ কোটি ৮১ লাখ টন এলএনজি রফতানির জন্য জাহাজীকরণ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় মাত্র ৭ শতাংশ বেশি।

ক্রেতারা পর্যাপ্ত গ্যাস ক্রয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। ব্যাহত হচ্ছে নতুন মজুদ ও ব্যবহার। অপ্রতুল বায়ুপ্রবাহ ইউরোপের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের ব্যবহার নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। অন্যদিকে চীনে বিদ্যুৎ সংকট এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব বিষয় মূল্যবৃদ্ধিতে জ্বালানি জোগাচ্ছে।

বর্তমানে দেয়া সবগুলো পূর্বাভাসই বলছে, এশিয়া অঞ্চলে শীত মৌসুমে এলএনজির দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারির মতো অতি মাত্রায় এলএনজি ক্রয়ে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বাজারদরকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেশে দেশে লকডাউনসহ নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে এলএনজির চাহিদায় ভাটা পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের মে মাসে এক এমএমবিটিইউর দাম রেকর্ড পরিমাণ কমে ১ ডলার ৮৫ সেন্টে নেমে আসে। ফলে উৎপাদকরা এলএনজি উৎপাদন কমিয়ে আনেন। গত বছরের গ্রীষ্মজুড়ে পণ্যটি রফতানিও সংকুচিত হয়। নিম্নমুখী উৎপাদন ও রফতানি গ্যাসের বৈশ্বিক মজুদে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করেছে। এসব বিষয় এবং উচ্চ জাহাজীকরণ ব্যয়ের কারণে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ১০ লাখ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের দাম ৩২ ডলার ৫০ সেন্টে পৌঁছায়। মাসের শেষে দাম এক ধাপ কমলেও আবার বাড়তে থাকে। সূত্র: রয়টার্স