দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতিমালা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম। তিনি বলেন, একক কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং নবায়নযোগ্য শক্তি, কয়লা ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে একটি টেকসই রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত পলিসি কনক্লেভে এসব কথা বলেন তিনি। ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক এ পলিসি কনক্লেভের আয়োজন করে বণিক বার্তা।
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশে প্রাথমিক জ্বালানির তীব্র ঘাটতি এবং নিজস্ব গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসার কারণেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। অতীতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধারাবাহিকভাবে যে অবহেলা করা হয়েছে, তার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। একক কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং নবায়নযোগ্য শক্তি, কয়লা ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে একটি টেকসই রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে শতভাগ জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জন বাস্তবসম্মত নয়। তবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। বাংলাদেশে অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্ব ও জমির তীব্র সংকটের কারণে বাসাবাড়ির ছাদে (রুফটপ সোলার) সৌর প্যানেল বসিয়ে বড় আকারের বিদ্যুৎ সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। ফলে কলকারখানার ছাদ ও সরকারি অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে বড় আকারের সোলার পার্ক গড়ে তুলতে হবে।
এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, নীতি বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। সরকারের পক্ষ থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এছাড়া, রামপালে ১ হাজার ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও সেখানে ৮০০ একর জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে। সরকার যদি এসব জমিতে অবকাঠামো তৈরি করে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ মডেলে বিনিয়োগকারীদের সুযোগ দেয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
তিনি বলেন, দেশে শীত ও গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদায় প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াটের ব্যবধান থাকে। ফলে শীতকালের চার মাস বহু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রাখতে হয় এবং বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট গুনতে হয়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। অদক্ষ যন্ত্রপাতির পরিবর্তে ইনভার্টার প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এসি, রেফ্রিজারেটর এবং সাশ্রয়ী ফ্যান ও মোটরের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ জন্য নীতিগত সহায়তার অংশ হিসেবে অদক্ষ যন্ত্রপাতির ওপর কর বাড়িয়ে শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ওপর রাজস্ব ছাড় দেওয়া উচিত।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা দরকার। একক কোনো অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত না হতে পারলে দেশে নবায়নযোগ্য শক্তির সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কঠিন হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল জরুরি মুহূর্তে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব।










