প্রতিকূল আবহাওয়ায় গমের শীর্ষ সরবরাহকারী দেশগুলোতে উৎপাদন কমছে। বিপরীতে অন্যতম ভোক্তা দেশগুলোতে বাড়ছে চাহিদা। ফলে আমদানিতে জোর দিচ্ছে তারা। আর চাহিদা ও সরবরাহের বিপরীতমুখী এ প্রবণতা এরই মধ্যে গমের আন্তর্জাতিক বাজার চাঙ্গা করেছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে যাচ্ছে এশিয়ার বাজারে। এ অঞ্চলে খাদ্যপণ্যটির সরবরাহ সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর রয়টার্স

গমের শীর্ষ উৎপাদক দেশগুলো কয়েক মাস ধরে তীব্র তাপদাহের মুখোমুখি রয়েছে। এসব দেশে খাদ্যশস্যটির ফলন নষ্ট হচ্ছে। ফলে রফতানি হাব হিসেবে পরিচিত কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল, কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে উৎপাদন মৌসুম শেষে সরবরাহ কম থাকবে। এর প্রভাব পড়বে আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে। কারণ বৈশ্বিক গমের এক-তৃতীয়াংশের ভোক্তা এ অঞ্চলের দেশগুলো। এরই মধ্যে সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হতে শুরু করেছে এখানকার অনেক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান। এ কারণে আটা-ময়দার উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে মিলগুলোও।

এশিয়ার অন্যতম গম উৎপাদক দেশ হিসেবে ধরা হয় চীনকে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মোকাবেলায় এবার আমদানিতে জোর দিচ্ছে দেশটি। এতে করে এ অঞ্চলে খাদ্যশস্যটির বাজারে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হবে।

করোনার প্রভাব কাটিয়ে এ বছর থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্য স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এতে এ বছর গমের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকার প্রত্যাশা ছিল ব্যবসায়ীদের। অনেক ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় দাম কিছুটা নিম্নমুখী হবে বলেও ধরে নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজার বিপরীত দিকে মোড় নিয়েছে।

এশিয়ার বাজারে গমের অন্যতম আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়া। আমদানীকৃত গম থেকে আটা-ময়দা ও নুডলস প্রস্তুতকারক একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর খাদ্যশস্যটির দাম কম হওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন তারা। কমপক্ষে ১০ শতাংশ দাম কমতে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে দাম প্রত্যাশার চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে।

এদিকে শীর্ষ উৎপাদক দেশগুলোতে চলতি উৎপাদন মৌসুমে গমের উৎপাদন কমে যাওয়ার পূর্বাভাসে বাজার আরো চাঙ্গা হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। মার্কিন কৃষি বিভাগের সাম্প্রতিক এক পূর্বাভাস বলছে, এ মৌসুমে অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারক দেশ কানাডা ও রাশিয়ায় গমের উৎপাদন দুই কোটি টনের মতো কমতে পারে। এছাড়া রুশ সরকার গম রফতানিতে শুল্ক বাড়িয়েছে। এ কারণে দেশটির ব্যবসায়ীরা রফতানির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে আরো দেরিতে রফতানি শুরু করতে পারেন, যা এশিয়ার বাজারে সরবরাহ সংকট তীব্র করবে।

মস্কোভিত্তিক কৃষিপণ্যবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সোভিকনের বিশ্লেষক অঁদ্রে সিজভের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া আগস্টে রাশিয়া থেকে ৩১ লাখ টন গম রফতানি হয়েছে, যা ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের একই মাসের তুলনায় ২০ শতাংশ কম। এছাড়া ২০২১-২২ শস্য মৌসুমে দেশটি থেকে খাদ্যশস্যটির রফতানি কমে ৩ কোটি ৩৯ লাখ টনে নামতে পারে, যা হবে ২০১৬-১৭ মৌসুমের তুলনায় সবচেয়ে কম।

তবে শুধু উৎপাদনের কারণেই গমের বাজার চাঙ্গা হচ্ছে না। বরং অন্যান্য খরচ বিশেষ করে জাহাজীকরণ খরচ বাড়ছে। ফলে আমদানিকারকদের জন্য এখন বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।

এশিয়ার বাজারে গমের অন্যতম সরবরাহকারী দেশ কানাডা। কিন্তু দেশটি থেকে খাদ্যশস্যটির আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, দেশটি থেকে প্রতি টন গম আমদানি করতে এখন এশিয়ার ক্রেতাদের বাড়তি ৩৫ ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের বাজার থেকে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর ব্যয়ের তুলনায় তা দ্বিগুণ। এছাড়া গত মাসে ইউক্রেন ও ফ্রান্সের রফতানি মূল্য বেড়েছে ২০ শতাংশের মতো। এ কারণে ক্রেতারা খাদ্যশস্যটির আমদানি কমিয়ে দিচ্ছেন।