প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজার ২০২১ সাল থেকেই সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ অবস্থায় উন্নতি হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন কমে যাওয়া, মজুদের নিম্নমুখী চাপ ও বৈরী আবহাওয়াকে এর পেছনে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের পর রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানির পরিবর্তে এলএনজি আমদানিতে মনোযোগ বাড়াচ্ছে ইউরোপ।
বিশ্বজুড়ে গত বছর গ্যাসের দাম নজিরবিহীন বেড়ে যায়। রেকর্ড দামের কারণে গ্যাসের বৈশ্বিক ব্যবহার ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে যায়। চলতি বছর চাহিদা প্রান্তিক পর্যায়ে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এলএনজির বৈশ্বিক বাণিজ্যের যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) পাঁচ বছরে ৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৮ সালে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ৪০ লাখ টন। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৭০ লাখ টনে। এ প্রবৃদ্ধিতে রসদ জুগিয়েছে ইউরোপ এবং চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো। এ সময় বৈশ্বিক সরবরাহের দুই-তৃতীয়াংশ অবদানই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার।
২০২৭ সাল নাগাদ এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদায় যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময় চাহিদা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে ইউরোপের দেশগুলো।
এদিকে চীনে ২০২৭ সাল নাগাদ চাহিদা প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চতায় তীব্র আকার ধারণ করেছে। কভিড-১৯ প্রতিরোধে আরোপ করা সব ধরনের বিধিনিষেধ উঠিয়ে নিলেও দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি এখনো অনেক শ্লথ।
২০২৩-২৫ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ টন এলএনজির নতুন সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এ সময় গ্যাসের বৈশ্বিক বাজার সংকুচিত থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৬-২৭ সাল নাগাদ ১০ কোটি টনের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। নতুন সক্ষমতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই যোগ করবে ৫০ শতাংশ। এ তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকবে রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া।
এলএনজি চাহিদার প্রধান উৎস হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশটি অস্ট্রেলিয়া ও কাতারকে হটিয়ে বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রফতানিকারক দেশ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় শিপব্রোকার বাঞ্চেরো কস্তা।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বৈশ্বিক এলএনজি লোডিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। লোডিং হয়েছে ১৪ কোটি ৩ লাখ টন। বৈশ্বিক এলএনজি রফতানিতে উদীয়মান নেতৃস্থানীয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর রফতানিতে দেশটি ছিল তৃতীয়। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল অস্ট্রেলিয়া ও কাতার।
২০২২ সালে এলএনজি রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের হিস্যা ছিল ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। বছরজুড়ে দেশটি ৭ কোটি ৯৪ লাখ টন এলএনজি রফতানি করে। আগের বছর রফতানির পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ২৫ লাখ টন। সে হিসাবে রফতানি ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
দেশটি থেকে রফতানি কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২০ সালে ৩১ দশমিক ৮, ২০১৯ সালে ৬৬ দশমিক ৩ ও ২০১৮ সালে ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে।
বাঞ্চেরো কস্তা জানায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র ২ কোটি ৮৮ লাখ টন এলএনজি রফতানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময় অস্ট্রেলিয়া রফতানি করেছে ২ কোটি ৭৫ লাখ টন। প্রবৃদ্ধির হার কম হলেও তা যুক্তরাষ্ট্রকে শীর্ষস্থান দখল করে নিতে সাহায্য করেছে। জানুয়ারি-এপ্রিল পর্যন্ত কাতার রফতানি করেছে ২ কোটি ৭০ লাখ টন এলএনজি। এক বছরের ব্যবধানে দেশটির রফতানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাজার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রেফিনিটিভের দেয়া তথ্য বলছে, সমুদ্রপথে গত বছর বৈশ্বিক এলএনজি রফতানি ব্যাপক বাড়ে। রফতানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ কোটি ৪৩ লাখ টনে, যা আগের বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানিতে ইউরোপ রাশিয়ার ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনছে। বিকল্প বাজার থেকে অঞ্চলটি জ্বালানিটির সরবরাহ নিশ্চিত করছে।










