চার বছর আগে হংকংয়ের ওপর কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইন আরোপ করে চীন। বেইজিংয়ের এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ওই সময় দেশটির গণতন্ত্রীপন্থীদের পাশাপাশি সমালোচনায় মুখর হয় বিভিন্ন দেশ। যদিও তাতে সমর্থন জানায় নগররাষ্ট্রটির সরকার। এবার সে আইন আরো কঠোর করে নিজস্ব সংস্করণ পাস করতে চায় হংকং সরকার। নিরাপত্তাসংক্রান্ত নতুন আইনের খবর সামনে আসার পর উদ্বেগ জানিয়েছে হংকংয়ে বিনিয়োগকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। খবর এশিয়া টাইমস।
এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হংকং। বিদেশী বিনিয়োগের একটি নিরাপদ গন্তব্য হিসেবেও পরিচিত নগররাষ্ট্রটি। কিন্তু আলোচনায় আসা নতুন নিরাপত্তা আইন অনুকূল পরিবেশকে প্রতিকূল অবস্থায় নিতে পারে বলে মত বিনিয়োগকারীদের। অনেকে বলছেন, নতুন আইন মেনে চলার জন্য তাদের অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় মেটাতে হতে পারে।
হংকং সরকার সম্প্রতি জানিয়েছে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩-এর আওতায় জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে হংকং। এ লক্ষ্যে জনমত জরিপও শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ১৩ হাজার ১৪৭টি মন্তব্য জমা পড়েছে। যার মধ্যে ৯৮ দশমিক ৬০ শতাংশ মন্তব্য আইনের পক্ষে এসেছে।
দেশটির সিকিউরিটি ব্যুরোর এক মুখপাত্র বলেন, ‘মোট মন্তব্যের মাত্র দশমিক ৭১ শতাংশ মন্তব্য আইনটির বিরুদ্ধে পড়েছে। যার সংখ্যা ৯৩টি। এর মধ্যে আবার ১০টি চীনবিরোধীদের।’
হংকংয়ের সেক্রেটারি ফর জাস্টিস পল লাম বলেন, ‘সরকার মন্তব্যগুলো একত্রে করে বিশ্লেষণ করবে। বিশ্লেষণে পাওয়া ফল আইনপ্রণেতাদের কাছে দাখিল করা হবে। যত দ্রুত সম্ভব আইন প্রণয়নের বিল চূড়ান্ত করব।’
এদিকে হংকংয়ের বাজারে বিনিয়োগকারী জার্মানি, ইউরোপীয় ও জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী চেম্বারস অব কমার্স পৃথকভাবে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা জানিয়েছেন, নতুন নিরাপত্তা আইন দেশটিতে বিনিয়োগকারীদের নতুন বিনিয়োগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
হংকংয়ের জার্মান চেম্বার অব কমার্স সভাপতি জোহানেস হ্যাক জানান, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার নতুন সংজ্ঞা দেশটির বিদ্যমান ‘এক দেশ দুই নীতি’ মর্যাদার বিপরীতে ‘এক দেশ’ পরিচয়কে বড় করে তুলতে পারে। যদিও হংকংয়ের মূল ভূখণ্ডের জন্য একটি স্বতন্ত্র ব্যবসায়িক সুবিধা হিসেবে ‘দুই নীতি’ বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, হংকংয়ের আলাদা হওয়া উচিত। জাতীয় নিরাপত্তার যে বিস্তৃত সংজ্ঞা; তা মেনে চলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হবে, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করতে পারে।’
ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেটরো) একটি জরিপ প্রকাশ করে। জরিপটি হংকং সরকার নিরাপত্তা আইন নিয়ে জনমত গ্রহণ শুরুর আগের জানুয়ারিতে পরিচালনা করা হয়।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতাদের এক-তৃতীয়াংশ বলছে—হংকংয়ের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ এক বছর আগের তুলনায় ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খারাপ’ হয়েছে। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত আগের জরিপের তুলনায় অনুপাতটি ২০ শতাংশের বেশি পয়েন্ট বেড়েছে।
জেটরো হংকংয়ের মহাপরিচালক শিনিয়া আমানো সম্প্রতি বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি সতর্কতার একটি অস্পষ্ট অনুভূতি তৈরি করছে, যা ব্যবসার ওপর একটি শীতল প্রভাব ফেলছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বেইজিং সব প্রার্থীর স্ক্রিনিং করায় গত ডিসেম্বর জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটারদের হার কম হওয়ায় কিছু কোম্পানি উদ্বিগ্ন ছিল। তারা ২০২০ সালে জুনে হংকংয়ে বেইজিং আরোপিত জাতীয় সুরক্ষা আইন সম্পর্কিত বিচার নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিল। কারণ ওই আইনে অভিযুক্ত অপরাধীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।’
হংকংকে ১৯৯৭ সালে চীনের কাছে হস্তান্তর করে ব্রিটেন। এরপর থেকে সেখানে মিনি সংবিধান কার্যকর হয়। এ মিনি সংবিধান বা হংকংয়ের মৌলিক আইনের ২৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রয়োজনীয় আইন তৈরির জন্য আইনসভায় একটি পরামর্শমূলক আলোচনা শুরু হয়।
নতুন আইনে রাষ্ট্রদ্রোহ, বিদ্রোহ, গুপ্তচরবৃত্তি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য চুরি, বিদেশী প্রভাব ও হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে— এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক সিস্টেম ব্যবহারসহ নাশকতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত।
এক বছর আগে হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় ২০২০ সালে বেইজিং তার নিজস্ব জাতীয় সুরক্ষা আইন আরোপ করেছিল। এ আইনে হংকংয়ে সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্তর্ঘাত বা বিদেশী শক্তির সঙ্গে আঁতাতের দায়ে যে কেউ জড়িত বলে মনে করা হলে তাদের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে শত শত গণতন্ত্রপন্থী সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়। বিচার প্রক্রিয়া শেষে তাদের কারাগারেও পাঠানো হয়।










