বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয় জুলাইয়ে স্বর্ণের চাহিদায় উল্লম্ফন দেখা গিয়েছে। বৈশ্বিক নিট রিজার্ভ বেড়েছে ৩৭ টন। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
ডব্লিউজিসির ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক কৃষাণ গোপাল বলেন, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয় স্বর্ণ ক্রয়ের পরিমাণ ২৭০ টনে উন্নীত হয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ এসব ব্যাংকে চাহিদা ৩০০ টনে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে জুলাইয়ে কাতারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল সর্বাধিক স্বর্ণ ক্রেতা। ওই মাসে ব্যাংকটিতে নতুন করে ১৫ টন স্বর্ণের মজুদ যুক্ত হয়েছে, যা ১৯৬৭ সালের পর সর্বোচ্চ। ব্যাংকটির মোট মজুদের পরিমাণ বর্তমানে ৭২ টন, যা দেশীয় মজুদের ১০ শতাংশ।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণের নিয়মিত ক্রেতা। জুলাইয়ে ব্যাংকটির মজুদে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ১৩ টন স্বর্ণ। গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর জুলাইয়ে ব্যাংকটি সর্বোচ্চ পরিমাণ স্বর্ণ ক্রয় করেছে। ক্রয়ের পরিমাণ বাড়ায় ব্যাংকটির মোট মজুদ দাঁড়িয়েছে ৭৮১ টনে, যা চলতি বছর শুরুর পর থেকে ২৭ শতাংশ বেশি।
তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জুলাইয়ে স্বর্ণের মজুদ ১২ টন বেড়েছে। বছরের এ পর্যন্ত ব্যাংকটির গড় স্বর্ণ ক্রয়ের পরিমাণ অপরিবর্তিত। মোট ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ টনে। উজবেকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাইয়ে অতিরিক্ত নয় টন স্বর্ণ ক্রয় করেছে। জুনেও একই পরিমাণ ক্রয় করা হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ২৫ টন বিক্রি করে দেয়ার পর বছরের এখন পর্যন্ত নিট ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ টনে।
জুলাইয়ে শুধু একটি ব্যাংকই ছিল লক্ষণীয় স্বর্ণ বিক্রেতা। সেটি হলো ন্যাশনাল ব্যাংক অব কাজাখস্তান। ওই সময় ব্যাংকটি ১১ টন স্বর্ণ বিক্রি করেছে। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছর ব্যাংকটির নিট বিক্রি ৩০ টনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও স্বর্ণের চাহিদা শক্তিশালী বলে জানিয়েছে ডব্লিউজিসি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিট ক্রয় বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্বর্ণের মজুদ ১৮০ টন বাড়িয়েছে। ওই সময় সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল তুরস্ক।
বছরের প্রথম ছয় মাসে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে অল্প কয়েকটি ব্যাংক। এর মধ্যে তুরস্ক ও মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বাধিক স্বর্ণ ক্রয় করে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মাঝে স্বর্ণ ক্রয়ের প্রবণতা ব্যাপক হারে কমেছে। ফলে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) মূল্যবান ধাতুটির বৈশ্বিক চাহিদা কমেছে ৮ শতাংশ। গতকাল এক প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল এ তথ্য জানিয়েছে।
সাধারণত অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময় স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়। এ বছরের শুরুতে ধাতুটির বিনিয়োগ চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। কারণ ওই সময় রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোয় আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয়। লাগাম ছাড়া হয়ে ওঠে মূল্যস্ফীতির হার। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের বাজার বাড়াতে শুরু করে। মূলত মুদ্রা সংকোচনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই ছিল এর উদ্দেশ্য। কিন্তু সুদের হার বাড়ানোর কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা বেড়েছে। ঊর্ধ্বমুখী করে তুলছে বন্ড ইল্ডকেও। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ক্রয়ের পরিমাণ বাড়লেও বিনিয়োগ খাতে আকর্ষণ হারাচ্ছে সেফ হ্যাভেন খ্যাত স্বর্ণ। অন্যদিকে ডলারের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডলারে কেনাবেচা হওয়া স্বর্ণ অন্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।










