মালয়েশিয়ায় এ বছরও তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে উৎপাদনের সবচেয়ে ভালো সময়ে পাম ফল সংগ্রহ করতে পারছে না দেশটির পাম অয়েল কোম্পানিগুলো। গাছেই নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার টন পাম ফল। শ্রমিক সংকটের কারণে এ নিয়ে টানা তৃতীয় বছরের মতো উৎপাদন নিয়ে বিপাকে পড়েছে দেশটি।

মালয়েশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ পাম অয়েল উৎপাদক দেশ। চলতি বছর দেশটিতে পাম অয়েল উৎপাদন কমে যাওয়ার আভাস মিলেছে। আর পরিস্থিতি যদি অনেক বেশি ভালো থাকে তবে উৎপাদন গত বছরের মতো অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই। উৎপাদক ও বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটিতে ১ কোটি ৮১ লাখ টন পাম অয়েল উৎপাদন হতে পারে।

মালয়েশিয়ান পাম অয়েল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোসেফ তেক বলেন, ১৯১৭ সালে যখন মালয়েশিয়ায় পাম অয়েল চাষ শুরু হয় তখন থেকেই শ্রমিক সংকট চলছে। দেশটির পাম অয়েল ফার্মগুলোয় মূলত প্রবাসী শ্রমিকরা কাজ করেন। কিন্তু বর্তমানে এসব শ্রমিকের সংখ্যা অনেক কমেছে।

২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারীর বিধিনিষেধের কারণে ভিসা প্রদান কিংবা অন্য দেশ থেকে ভ্রমণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভয়াবহ শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। যার ফলে তলানিতে নামে পাম অয়েল উৎপাদন। গত বছর মহামারীর বিধিনিষেধ উঠে গেলেও সংকট কাটেনি।

মালয়েশিয়ায় পাম অয়েল উৎপাদন মৌসুমে আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চার মাস ফলনের সবচেয়ে ভালো সময়। এরই মধ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন পরিস্থিতিও উন্নতির দিকে। কিন্তু দক্ষ শ্রমিকের অভাবে পাম ফল সংগ্রহ নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর। মৌসুম শেষে তারা সম্পূর্ণ পুঁজি উঠিয়ে আনতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এদিকে উৎপাদন ঘাটতির কারণে ফিউচার মার্কেটে মালয়েশিয়ান অপরিশোধিত পাম অয়েলের দাম ব্যাপক বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বছরের মার্চে পণ্যটির দাম রেকর্ড সর্বোচ্চে আরোহণ করেছিল। কিন্তু এর পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের বহুল ব্যবহূত ভোজ্যতেলটির দাম অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।

তথ্য বলছে, ২০২০ সালে কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে অন্য দেশ থেকে শ্রমিক আসার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে মালয়েশিয়া। ফলে ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হয়। মূলত পাম গাছের পরিচর্যা ও পাম ফল সংগ্রহ করেন এসব শ্রমিক।

ওই বছর (২০২০-২১ বিপণন মৌসুম) শ্রমিকের অভাবে পাম অয়েল উৎপাদন ৪০ বছরের সর্বনিম্নে নেমে যায়। ফলে ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক সংকট মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তার ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এ সংকটকে উসকে দেয়। মূলত এ কারণেই মার্চে পাম অয়েলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে, যার প্রভাবে বাড়তে থাকে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি। বৃদ্ধি পায় ডিটারজেন্ট ও অন্যান্য পাম অয়েলজাত পণ্যের দামও।

যদিও এরপর বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়া পুনরায় পাম অয়েল রফতানি শুরু করার পর পণ্যটির দাম কমতে শুরু করে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সয়াবিন উৎপাদনের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে তেলবীজ উৎপাদন।

সরকার কভিড-১৯ রোধে আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে ফেব্রুয়ারিতে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। মালয়েশিয়ার পাম অয়েল শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এসব বিধিনিষেধ পুরোপুরি উঠিয়ে নিলে শ্রমিক সংকট কমে আসবে। তারা নতুন করে ৫২ হাজার শ্রমিকের মালয়েশিয়ায় প্রবেশের সম্ভাবনা দেখছেন। যদিও এখন পর্যন্ত দেশটিতে নতুন করে মাত্র কয়েক হাজার শ্রমিক ঢুকেছেন। কারণ দেশটির সরকার কমসংখ্যক শ্রমিককে ভিসা দিচ্ছে।