তিনি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির অভাব, প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে খাতটিকে আধুনিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে।’

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট-পরবর্তী বীমা খাত: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. তিতুমীর বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের বীমা খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় ডিজিটালাইজেশন হয়নি। ফলে গ্রাহকসেবা, দাবি নিষ্পত্তি, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শুধু গ্রাহক সন্তুষ্টিই বাড়বে না, একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতাও বহুগুণ বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তাই দুর্যোগজনিত ক্ষতি মোকাবেলা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী বীমা খাত গড়ে তোলা সময়ের দাবি। কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ঘাটতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।’

অধ্যাপক তিতুমীর আরো বলেন, ‘শুধু প্রচলিত তদারকির ওপর নির্ভর করলে হবে না। খাতভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়িয়ে আরো কার্যকর ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেই বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন তার বক্তব্যে বলেন, ‘বীমা খাতের টেকসই সংস্কারের জন্য তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে—গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ শক্তিশালী করা এবং মানবসম্পদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। বর্তমানে বীমা খাতে গ্রাহকদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর কিছু সমস্যা পুরো খাতের, আবার কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে আইডিআরএ এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাঈদ আহমেদ (এমপি) বলেন, ‘বীমা কমিশনকে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও অনিয়মের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে মোটরযান বীমাকে আরো কার্যকরভাবে বাধ্যতামূলক করা এবং নতুন নতুন খাতে বীমা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।’

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী বলেন, ‘দেশে এমন অনেক বীমা কোম্পানি রয়েছে, যারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তি করে। কিন্তু এসব ইতিবাচক উদ্যোগ খুব কমই প্রচার পায়। বরং যেখানে দাবি পরিশোধে বিলম্ব বা জটিলতা হয়, সেগুলোই বেশি আলোচিত হয়। ফলে বীমা খাতের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডও জনসাধারণের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে বীমা খাতের গুরুত্ব অনেক হলেও এটি এখনো অবহেলিত। বীমার প্রবেশযোগ্যতা খুবই কম, যা বাড়াতে হবে। দুর্বল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, স্বল্পমেয়াদি লাভের মানসিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এ খাতের প্রধান সমস্যা।’

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইআরএফের সভাপতি গোলাম মওলা। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক যুগান্তরের বিজনেস এডিটর মনির হোসেন।