কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ধস মোকাবেলা করে যাচ্ছে চীনের আবাসন শিল্প। জানুয়ারির শেষদিকে এ খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান এভারগ্র্যান্ডকে অবসায়নের নির্দেশ দেন দেশটির আদালত। এখন দেশটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা বড় কোনো বেলআউট সুবিধা পাবেন না। সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হচ্ছে, যারা ‘জনগণের স্বার্থের ক্ষতি করে’ তাদের শাস্তি পেতে হবে। খবর সিএনবিসি।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের আবাসন ও নগর-পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী ড. নি হং বলেন, ‘‌আবাসন কোম্পানিগুলোর মধ্যে যারা গুরুতরভাবে অসচ্ছল এবং পরিচালনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, তাদের আইন ও বাজার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দেউলিয়া ঘোষণা বা পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেতে হবে।’

‘যথাযথ মূল্য দিতে বাধ্য করা হবে’ উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘জনগণের স্বার্থের জন্য হানিকর এমন কাজ যারা করেন তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে তদন্ত করা হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সম্প্রতি চীনের বার্ষিক সংসদীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের অর্থনৈতিক মন্থরতার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আবাসন খাতের ব্যর্থতা। এ খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এভারগ্র্যান্ড ও কান্ট্রি গার্ডেনের ঋণ খেলাপ সারা বিশ্বে আলোচিত হয়েছে। পুনর্গঠন প্রশ্নে সফল না হওয়ায় জানুয়ারিতে এভারগ্র্যান্ডকে অবসায়ন নির্দেশ দেন আদালত। এটি ছিল দেশটির আবাসন খাতে সর্বশেষ ধাক্কা।

উচ্চ ঋণের প্রতি ডেভেলপারদের নির্ভরতা কমাতে ২০২০ সালে বেইজিং কিছু পদক্ষেপ নেয়। ওই সময় অনেক কোম্পানি অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির কাজ শেষ করতে সমস্যায় পড়ে যায়। দেশটিতে সাধারণত অ্যাপার্টমেন্টের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু কিছু ক্রেতা মর্টগেজ বন্ধ করে দেয়ায় বিপাকে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো। তখন কিছু ডেভেলপারকে অর্থায়নের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দেয় সরকার। তবে ওই ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। কারণ নীতিগতভাবে চীন সরকার অর্থনীতিতে রিয়েল এস্টেটের ভূমিকা কমানোর বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেনি।

আবাসন খাতের এ ঝুঁকি নিয়ে শুরু থেকেই ওয়াকিবহাল ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ধারণা করা হচ্ছিল, বেল আউট প্যাকেজের মাধ্যমে এ খাতের সবচেয়ে বড় কোম্পানিকে পতনের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে চীন সরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এভারগ্র্যান্ড ও অন্যান্য আবাসন সংস্থার ঋণকে দেশটির আর্থিক ব্যবস্থা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি বলে মনে করেন শি জিনপিং। এ কারণে ২০২০ সাল থেকে কর্তৃপক্ষ ধীরে ধীরে আবাসন খাতে ঋণের বিষয়ে কঠোর হয়েছে।

মার্চের প্রথম সপ্তাহে দেশটির বার্ষিক সংসদীয় বৈঠকে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিনিয়োগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। সেখানে আবাসন খাত তেমন গুরুত্ব পায়নি।

গত সপ্তাহে অর্থনীতি বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন মন্ত্রী ড. নি হং। ওই সময় ‘জীবিকা’ নিয়ে মন্তব্য করলেও আবাসন খাত অল্প মনোযোগ পায়। তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদে আবাসন খাত ও সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নিয়ে কাজ করবে সরকার। 

আবাসন খাতের অবস্থানগত পরিবর্তন চীনের সামগ্রিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। একসময় এ খাত থেকে আসত চীনের জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ। বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএস বিশ্লেষকরা গত বছরের শেষদিকে জানান, এখনো চীনা অর্থনীতির প্রায় ২২ শতাংশ আবাসন খাতনির্ভর।

সামগ্রিকভাবে আবাসন বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে চীন সরকার। সম্প্রতি তেমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন, সামনের বছরে আবাসন খাতে নতুন উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলবে চীন। আবাসন নির্মাণে সরকারি ভর্তুকি বাড়ানো হবে। জনগণের উন্নত আবাসনের চাহিদা মেটাতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হবে।